দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছেন হুমায়ুন। কষ্টার্জিত টাকা দেশে পাঠিয়ে তিনি যেমন নিজের পরিবারকে সামলাচ্ছেন, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন। তবে প্রায় দুই দশকের এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পরও তার মাসের আয় কিন্তু ওই ১ লাখ ১০ হাজার টাকার আসেপাশেই আটকে আছে।
হুমায়ুন মনে করেন, বিদেশে আসার আগে যদি তিনি কাজটা ভালোভাবে শিখে নেওয়ার বা সঠিক প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ পেতেন, তবে আজ তার আয় অনেক বেশি হতে পারত।
হুমায়ুনের এই গল্প কেবল তার একার নয়; এটি বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির এক বড় দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ কাজের খোঁজে বিদেশে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের বেশিরভাগকেই কম আয়ের সাধারণ কাজগুলো বেছে নিতে হচ্ছে। তারা ভালো পদের বা বেশি বেতনের চাকরি পাচ্ছেন না।
বিশ্বজুড়ে এখন কাজ জানা দক্ষ মানুষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো সেই আগের মতোই অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপরই ভরসা করে আছে। ফলে দেশ থেকে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা যতই বাড়ুক না কেন, সেই তুলনায় প্রবাসীদের কাছ থেকে আসা টাকার পরিমাণ অনেক কম থেকে যাচ্ছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের মতো রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর পরের বছর এই আয় বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলার পার হয় এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা পৌঁছায় সাড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে এই আয় অনেক বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ যদি কম বেতনের অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে এসে কাজ জানা দক্ষ কর্মী ও পেশাজীবী পাঠাতে পারত, তবে এই আয়ের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতো।

অন্যান্য প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবাসীরা যে আয় করছেন, তা সত্যিই বেশ কম। গত বছর ভারতের প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ প্রবাসী দেশের বাইরে কাজ করে প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ, তাদের প্রতি কর্মী বছরে গড়ে ৭ হাজার ৮০০ ডলারের বেশি আয় করেছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী কর্মী দেশের বাইরে থাকলেও কর্মীপ্রতি গড় আয় ৪ হাজার ৫০০ ডলারের নিচে। বাংলাদেশের চেয়ে ছোট দেশ শ্রীলঙ্কার প্রবাসীরা কর্মীপ্রতি প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডলার আয় করছেন। এমনকি পাকিস্তান আর নেপালের কর্মীরাও বাংলাদেশের কর্মীদের চেয়ে বেশি আয় করছেন।
আয়ের এই বিশাল পার্থক্যের প্রধান কারণ বাংলাদেশের প্রবাসীরা কী ধরনের কাজ পাচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া প্রতি ১০ জন কর্মীর মধ্যে প্রায় ৭ জনই যাচ্ছেন কোনো ধরনের বিশেষ দক্ষতা ছাড়া। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি বেতনের ভালো চাকরি পাওয়ার সুযোগ তাদের শুরুতেই বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আমাদের প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে দক্ষ কর্মী মাত্র ২২ শতাংশ, আধা-দক্ষ কর্মী ৭ শতাংশ, আর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের মতো পেশাজীবীর সংখ্যা মাত্র শূন্য দশমিক চার শতাংশ। অর্থাৎ, বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৭১ শতাংশই মূলত অদক্ষ।
অথচ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক নির্মাণ কাজ, কারখানা বা শিল্পপ্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও মেশিন চালানোর মতো খাতগুলোতে দক্ষ মানুষের বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে।
কম বেতনে টিকে থাকা অভিবাসন
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর এখনো ১০ লাখেরও বেশি মানুষ কাজের খোঁজে বিদেশে যাচ্ছেন। শুধু ২০২৫ সালেই কাজের জন্য বিদেশে গেছেন ১১ লাখ ৩১ হাজার ১৭৩ জন বাংলাদেশি।
এত বিপুল সংখ্যক কর্মী বিদেশে যাওয়ার অর্থ হলো বিশ্বের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের আলাদা একটা চাহিদা এখনো আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ কর্মী এখনও রোড-বিল্ডিং বা কনস্ট্রাকশন, কৃষিকাজ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, বাসা-বাড়ির কাজ বা সাধারণ কায়িক শ্রমের মতো জায়গাগুলোতেই যোগ দিচ্ছেন। এই ধরনের কাজগুলোতে বেতন যেমন কম, তেমনি এখানে ক্যারিয়ারে উন্নতির সুযোগও খুব সীমিত।
শ্রমবাজার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, কতজন মানুষ বিদেশে পাঠানো গেল—শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে প্রবাস খাতের সাফল্য মাপা ঠিক নয়। আসল সফলতা হলো কতজন কর্মী ভালো কাজ শিখে বিদেশে গিয়ে বেশি বেতনের চাকরি নিশ্চিত করতে পারলেন।
বাংলাদেশের প্রবাসীদের একটা বড় অংশই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানে দেখা যায়, একজন কাজ জানা দক্ষ মানুষের আয় একজন সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশি।
যেমন ওয়েল্ডিংয়ের কাজ, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, কম্পিউটার চালিত সিএনসি মেশিন অপারেটর, রডমিস্ত্রি বা স্টিল ফিক্সার, নার্স, বয়স্কদের সেবাদানকারী কেয়ারগিভার ও কারখানার টেকনিশিয়ানরা একই দেশে একজন সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি আয় করেন। পাশাপাশি তারা থাকার ভালো সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা, বাড়তি কাজ করে বাড়তি আয় (ওভারটাইম) এবং চাকরির ভালো নিরাপত্তাও পেয়ে থাকেন।
কিন্তু এত সুবিধার পরও বাংলাদেশের শ্রমবাজার প্রধানত কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এমনকি ২০২৪ সালে বিদেশে যাওয়া মোট বাংলাদেশি কর্মীর প্রায় ৬২ শতাংশই গিয়েছেন কেবল সৌদি আরবে।
উচ্চ আয়ের বাজারে ঢুকতে পারছে না বাংলাদেশ
বর্তমানে বিশ্বের শ্রমবাজার খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে কর্মক্ষম মানুষের চেয়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে, নতুন নতুন শিল্প কারখানা হচ্ছে, চিকিৎসা খাতের চাহিদা বাড়ছে। এই কারণে এসব দেশে এখন কাজের লোকের ভীষণ অভাব।
কিন্তু বাংলাদেশ এই নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারছে না। এমনকি মালয়েশিয়ার মতো যে পুরনো বাজারে বাংলাদেশ বহুদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, সেখানেও বাংলাদেশের কর্মীরা মূলত কৃষি আর নির্মাণ খাতেই আটকা পড়ে আছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর শ্রমবাজারে ঢুকতে হলে শুধু হাতের কাজ জানলেই চলে না। এর জন্য আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃত প্রশিক্ষণ, কাজের সনদ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা জানা জরুরি।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জার্মানির মতো দেশগুলোতে কাজ জানা অনেক টেকনিক্যাল মানুষ থাকা সত্ত্বেও কেবল ভাষার দক্ষতা না থাকার কারণে তারা ভালো বেতনের চাকরিগুলো থেকে বঞ্চিত হন।
আল জামান ওভারসিজ ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শামীম জানান, বিদেশের মালিকরা মূলত অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ওয়েল্ডার, মেশিন চালক, টাইলস মিস্ত্রি, ইট গাঁথুনির ব্লক মেসন ও রডমিস্ত্রি খুঁজছেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি নিয়ম মেনে কাজ জানা সঠিক কর্মীদের নিয়মিত পাঠাতে পারে, তবে ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোতে কাজের বিশাল সুযোগ রয়েছে।’
তার মতে, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যাগুলো হলো–ভাষার সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকা, আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং সেন্টারের অভাব, সঠিক সনদ ব্যবস্থার ঘাটতি, দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তির দুর্বলতা এবং লোক পাঠানোর নিয়মে স্বচ্ছতা না থাকা।
অন্য দেশের কর্মীরা কেন এগিয়ে
বিশ্বের কাজের বাজারে বাংলাদেশের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ভারত, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম। এই দেশগুলোর সাফল্যের মূল রহস্য হচ্ছে বিদেশের বাজারে কোন কাজের চাহিদা বাড়ছে, তারা নিজেদের দেশের কর্মীদের ঠিক সেভাবেই গড়ে তুলছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি খাতে ভালো মানের পেশাজীবী বানিয়ে বিশ্বজুড়ে নিজেদের এক আলাদা সুনাম তৈরি করেছে। ভালো পড়াশোনা এবং প্রায় সবার ইংরেজি বলার দক্ষতাই তাদের এই সাফল্য এনে দিয়েছে।
ফিলিপাইন তাদের কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, ইংরেজি ভাষা ও সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করে বিশ্বজুড়ে হাসপাতাল ও কেয়ারগিভিং বা সেবা খাতে নিজেদের দখল মজবুত করেছে।
আর ভিয়েতনাম কারখানা, ইলেকট্রনিক্স পণ্য তৈরি, মেশিন চালানো ও কারিগরি কাজের জন্য নিজেদের কর্মীদের প্রস্তুত করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বাজারে সাফল্যের সঙ্গে লোক পাঠাচ্ছে।
অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তফাত শুধু মানুষের সংখ্যায় নয়; তাদের আসল শক্তি হলো তারা একজন সাধারণ মানুষকেও প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশ্বমানের কর্মী বানিয়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ যেখানে পিছিয়ে পড়ছে
বাংলাদেশে কাজের লোক বা দক্ষ জনশক্তি তৈরির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এখানকার প্রশিক্ষণের মান আন্তর্জাতিক মানের নয়।
অনেক ট্রেনিং সেন্টারে ভালো শেখানোর মতো যোগ্য শিক্ষক নেই, আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, এমনকি পুরনো সিলেবাসেই কাজ চালানো হয়। বিদেশের মালিকরা যখন এসব ট্রেনিং সেন্টার দেখতে আসেন, তখন তারা চাকরিপ্রার্থীরা আসলেই বাস্তবে কাজ পারবে কি না—তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতার সঠিক যাচাই এবং বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য সনদের ওপর জোর দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক ছেলেমেয়েই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু বিদেশের বাজারে যে ধরনের নির্দিষ্ট দক্ষতা দরকার, তা তাদের থাকে না।’
সমস্যা শুধু এই ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে নয়। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা কী, তার সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো মিল নেই। বিদেশের বাজারে যেসব বিষয়ের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা কারিগরি কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের সেভাবে গড়ে তুলতে পারছে না।
সুযোগ হাতছাড়া করার আসল মূল্য
বাংলাদেশে এখন তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা যেকোনো দেশের জন্য এক বিশাল বড় শক্তি। তবে এই সুযোগ সবসময় থাকবে না।
বাংলাদেশ যদি এখনই কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শেখা, আন্তর্জাতিক সনদ আর বাজারবান্ধব প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পেছনে বড় বিনিয়োগ না করে, তবে হয়তো হাজার হাজার মানুষ বিদেশে পাঠাতে পারবে ঠিকই, কিন্তু তাদের থেকে যে পরিমাণ টাকা আয় করা সম্ভব ছিল–তার খুব ছোট একটা অংশই কেবল দেশে আসবে।
জনশক্তি রপ্তানির ভবিষ্যৎ এটা দিয়ে মাপা হবে না যে বাংলাদেশ কত লাখ লোক বিদেশে পাঠালো। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—বিশ্বের বদলে যাওয়া বাজারে যে ধরণের দক্ষ কর্মীর চাহিদা তৈরি হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবাসীরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন কি না, তার ওপর।


