জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও নদী ভরাটের পাশাপাশি ভয়াবহ এক নতুন বিপদের মুখে পড়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ ‘সুন্দরী’। এই বিপদের নতুন নাম পরগাছা। পরজীবী এই উদ্ভিদের আক্রমণে আশঙ্কাজনক হারে মরছে সুন্দরী গাছ। আগে শুধুমাত্র গাছের শাখা-প্রশাখায় এটি সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা সুন্দরী গাছের মূল কাণ্ড ও প্রধান অংশে বিস্তার লাভ করছে। ফলে দ্রুত দুর্বল হয়ে মারা যাচ্ছে গাছগুলো।
গত কয়েক বছর ধরে এই উপদ্রব অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় বনের সার্বিক অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামরা রোগ (টপ ডাইং) ও পরগাছার এই বিস্তার অনতিবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী এক-দুই দশকের মধ্যে সুন্দরী গাছ বিলুপ্ত উদ্ভিদের তালিকায় চলে যেতে পারে। এর ফলে যেমন বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে, তেমনি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকা ও জীবন-জীবিকা রক্ষা করা উপকূলীয় বাসিন্দাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
পরগাছা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা না হওয়ায় বন বিভাগও এর থেকে পরিত্রাণের সুনির্দিষ্ট উপায় নির্ধারণ করতে পারছে না।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন ইউনেস্কো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় বিস্তৃত ৬ হাজার ৫১৭ বর্গকিলোমিটারের এই বন বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় যুগের পর যুগ ধরে ভূমিকা রাখছে। এই বনের নামকরণও হয়েছে ‘সুন্দরী’ গাছের নামে। একসময় গোটা সুন্দরবনের বেশিরভাগ অঞ্চলজুড়ে সুন্দরী গাছের রাজত্ব থাকলেও এখন তা মারাত্মক হুমকির মুখে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে ১৮৪ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। যদিও এই জরিপে এককভাবে সুন্দরী গাছের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি, তবে সুন্দরী, গেওয়া ও গড়ান—এই তিন প্রজাতি মিলে মোট উদ্ভিদের ৭০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের সমগ্র সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি প্রকৃত ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ। এছাড়া বনে ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড, ২৮ প্রজাতির ঘাস এবং ৯ প্রজাতির ছত্রাক রয়েছে।
এই বনে রয়েছে ৪৫৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও সুন্দরবনে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী, খাল ও বিলে ৩০০ প্রজাতির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি এবং কয়েক প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়।
উপকূলের প্রাকৃতিক দেয়াল
সুন্দরী গাছ প্রকৃতিগতভাবেই শক্তপোক্ত এবং এর শেকড় মাটির ক্ষয় রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই গাছ বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা থেকে উপকূলকে রক্ষা করতে প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া সুন্দরীর শেকড় ও ঝরা পাতা নানা প্রজাতির মাছ, চিংড়ি ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও আশ্রয়ের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে।
সুন্দরী গাছ কমে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) ও খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ সুন্দরী গাছের গোড়ার শেকড়ে নানা জাতের মাছ ও চিংড়ি আশ্রয় নেয়, শাখায় বাসা বাঁধে নানা জাতের পাখি এবং বাঘ ও হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর প্রধান আশ্রয়স্থল এই গাছ। আবার বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ ও অন্যান্য প্রাণী। ফলে সুন্দরী গাছ ধ্বংস হলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল বিপন্ন হবে।
ভরাট হচ্ছে ‘ভোলা নদী’, কমছে বনের পানি প্রবাহ
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা ভোলা নদী পলি জমে ভরাট হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারাণী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ি থেকে নাংলী, ধানসাগর, জিউধরা ও কদলমতেজী হয়ে জয়মনী পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এটি এখন স্থানীয়ভাবে ‘মারা ভোলা’ নামে পরিচিত।
ভোলা নদী ভরাট হওয়ায় বনের ভেতরের শাখা খালগুলো মরে গেছে, কমে গেছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। বনের তুলনামূলক উঁচু এলাকায় মিষ্টি পানি প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে এই অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, যা সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ ও পরগাছার আক্রমণকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

পরগাছার আক্রমণের ধরন ও বহুমুখী সংকট
বনবিভাগের হিসাব মতে, বর্তমানে সুন্দরবনের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছ পরগাছায় আক্রান্ত। এই পরজীবী উদ্ভিদ মূল গাছ থেকে শুরু করে ডালপালা আঁকড়ে বেড়ে ওঠে এবং মূল গাছের রস শোষণ করে বেঁচে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়, পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে এবং একসময় পুরো গাছ শুকিয়ে মারা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বনে সৃষ্টি হচ্ছে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও পানির লবণাক্ততা। অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসে বনের উপরিভাগে লবণাক্ত পানি ও পলি জমার কারণে নানা প্রজাতির পরগাছা, লতাগুল্ম ও ছত্রাকের জন্ম হচ্ছে, যার অধিকাংশ আক্রমণ করছে সুন্দরী গাছকে। এছাড়া নদী-খাল ভরাট হওয়ায় মিঠা পানির প্রবাহ কমে কীট-পতঙ্গ ও ছত্রাকের আক্রমণ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের করুণ চিত্র
সুন্দরবনের ওপর সরাসরি নির্ভর করে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা। বন থেকে মাছ, কাঁকড়া, মধু, মোম, ছন, গোলপাতা আহরণ ও পর্যটন ব্যবসার মাধ্যমে তারা জীবন ধারণ করেন। তবে বনের চলমান বিপর্যয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
শরণখোলার খুড়িয়াখালী গ্রামের মৌয়াল মো. শাহজাহান আকন (৬০) ও মো. আউয়াল খাঁন (৫৫) জানান, তারা দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর ধরে মধু আহরণ করে আসছেন। তবে এখন আর আগের মতো মধু পাওয়া যায় না। বনের অনেক জায়গায় গাছপালা শুকিয়ে ফাঁকা হয়ে গেছে, আর মরা গাছে মৌমাছি চাক বাঁধে না। ফলে ৪-৫ কিলোমিটার হেঁটেও একটি মৌচাকের দেখা মিলছে না।
একই গ্রামের জেলে মো. আশরাফ আলী ফরাজী (৭০) ও মো. রুস্তম গোলদার (৬০) জানান, বনের খাল ভরাট ও গাছপালা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু মাছ চিত্রা, শিলন ট্যাংরা, ডগরি মাছ এখন আর বললেই চলে না।
অন্যদিকে অনলাইনে সুন্দরবনের মাছ, মধু, গোলপাতার গুড়, কেওড়ার আচার বিক্রি ও পর্যটন ব্যবসা পরিচালনা করেন শরণখোলার রাসেল আহমেদ ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হাফিজুর রহমান। তাদের মাসিক বিক্রির পরিমাণ এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। রাসেল ও হাফিজ জানান, বনে প্রতিনিয়ত অসংখ্য সুন্দরী গাছ পরগাছায় আক্রান্ত হয়ে মরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকলে পুরো অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি ধসে পড়বে।

বিশেষজ্ঞ ও বনবিভাগের বক্তব্য
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরী গাছের বিন্যাস ও গঠনে বিরূপ পরিবর্তন আসছে। সুন্দরবনে কৃত্রিম প্ল্যান্টেশনের সুযোগ নেই; গাছ মরে ফাঁকা হওয়া স্থান অন্য গাছ প্রাকৃতিকভাবে দখল করে নিচ্ছে। তবে সুন্দরী গাছ আশঙ্কাজনক হারে কমলে বনের অস্তিত্ব ও পরিবেশ চরম হুমকিতে পড়বে। তাই পরগাছা ও মড়ক রোধে ব্যাপক গবেষণা ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (খুলনা লোনাপানি কেন্দ্র) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, পলি জমে খাল ভরাট হওয়া, মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস এবং সুন্দরী গাছের শেকড় ও ঝরা পাতা কমে যাওয়ায় ছোট মাছ ও চিংড়ির প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও অতিমাত্রায় অপরিকল্পিত মৎস্য আহরণের ফলে সামগ্রিক মৎস্য সম্পদ কমে যাচ্ছে, যা বিশাল জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, টপ ডাইং রোগের পর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ গাছে পরগাছার আক্রমণ বন বিভাগের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরী গাছ রক্ষায় দ্রুত পরজীবী বিষয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ভোলা নদীর ভরাট হওয়া ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে ১ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। বাকি অংশ খননের কাজ বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। পরবর্তীতে বাকি অংশ খনন করা হলে বনের বিশাল অংশে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে সুন্দরবন পুনরায় সজীবতা ফিরে পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


