একসময় বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস ছিল পাট। ‘সোনালী আঁশ’ খ্যাত এই অর্থকরী ফসলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল দেশের শিল্প, রপ্তানি ও গ্রামীণ অর্থনীতির শক্ত ভিত। কৃত্রিম তন্তু ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের দাপটে দীর্ঘদিন পাটের সেই ঐতিহ্য ম্লান হয়ে থাকলেও আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশের পাটখাত। পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং বাজারে তুলনামূলক ভালো দামের কারণে রাজশাহীতে নতুন করে বাড়ছে পাট চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ।
চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় সরকারি লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে পাটের আবাদ হয়েছে। মাঠজুড়ে এখন সবুজ পাটগাছের সারি কৃষকের মুখে ফিরিয়ে এনেছে আশার হাসি। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর থেকেই শুরু হবে আগাম জাতের পাট কাটা। ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্যের প্রত্যাশায় এবার বেশ আশাবাদী কৃষকরা।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর এই আবাদ ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাটের আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর।
চলতি বছরে জেলায় ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন। সে হিসাবে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি।
অন্যদিকে পাট অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর রাজশাহীতে প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি।
মাঠে ভালো ফলনের আভাস
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা এবং উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে এবার পাটের বৃদ্ধি অত্যন্ত ভালো হয়েছে।
রাজশাহীতে সাধারণত চৈত্র ও বৈশাখ মাসে পাটের বীজ বপন করা হয়। এরপর শ্রাবণ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত চলে পাট কাটা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ। আগাম জাতের পাট জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই কাটা শুরু হয়।
বর্তমানে মাঠে পাটের গাছের উচ্চতা, ঘনত্ব ও স্বাস্থ্য ভালো থাকায় কৃষি বিভাগ এবার উৎপাদন নিয়ে আশাবাদী।
রাজশাহীর নওহাটা পাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পাট সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এই দাম কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
কৃষকদের মতে, বাজারে এ ধরনের দাম অব্যাহত থাকলে আগামী বছর আরো বেশি জমিতে পাটের আবাদ হবে।
বাঘা উপজেলার আশরাফপুর এলাকার কৃষক লিটন আলী বলেন, ‘এ বছর আমি ১৫ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছি। সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হওয়ার আশা করছি। যদি প্রতি মণ পাট ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি করতে পারি, তাহলে উৎপাদন খরচ উঠিয়ে ভালো লাভ হবে।’
উপজেলার চাঁদপুর বেংগাড়ী এলাকার কৃষক নাসির উদ্দীন বলেন, ‘এ বছর আমি ১০ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় গাছের বৃদ্ধি খুব ভালো হয়েছে। অনেক গাছই সাত থেকে নয় ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে এবং ফলনও আশাব্যঞ্জক। সরকার পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করলে এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ালে সোনালী আঁশের সেই সুদিন আবারও ফিরে আসবে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম না পেলে ভবিষ্যতে পাট চাষ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’
পবা উপজেলার কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, তিনি এবার চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন। মাঠে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। আগাম জাতের পাট বাজারে আগে ওঠায় ভালো দাম পাওয়া যায়। তবে শ্রমিক সংকট এবং পাট জাগ দেওয়ার সমস্যা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চারঘাট উপজেলার কৃষক হৃদয় বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার জমিতে পাটের অবস্থা অনেক ভালো। কৃষক ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী বছর আরো বেশি মানুষ পাট চাষে এগিয়ে আসবেন।’
পাটের সম্ভাবনা বাড়লেও কয়েকটি সমস্যা এখনো কৃষকদের ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে—পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি ও জলাশয়ের সংকট; শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকট; বাজারে দামের ওঠানামা; সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির অভাব।
কৃষকদের মতে, এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে পাটচাষ আরও লাভজনক হয়ে উঠবে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উন্নত বীজ, কৃষকদের আগ্রহ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাট শুধু একটি অর্থকরী ফসল নয়, এটি পরিবেশবান্ধব কৃষি অর্থনীতিরও অন্যতম ভিত্তি।’
পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার বলেন, বর্তমান বাজারে প্রতি মণ পাট সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকার কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করায় পাটচাষে আগ্রহ বাড়ছে।
বিশ্ববাজারে নতুন সুযোগ
বিশ্বজুড়ে ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানোর উদ্যোগ জোরদার হওয়ায় পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। পাটের তৈরি ব্যাগ, জিও-টেক্সটাইল, কম্পোজিট পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কার্পেট, ফ্যাশন সামগ্রীসহ নানা পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু কাঁচা পাট উৎপাদন নয়, পাটভিত্তিক শিল্পের আধুনিকায়ন, মূল্য সংযোজন এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন বাড়াতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, আধুনিক রেটিং (জাগ) প্রযুক্তি, সংরক্ষণ সুবিধা এবং শক্তিশালী বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে রাজশাহী দেশের অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
পাশাপাশি পাটভিত্তিক শিল্প স্থাপন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো গেলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কৃষকের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
একসময় যে পাট বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, আবারও সোনালী আঁশের সেই সুদিন ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজশাহীতে আবাদ বৃদ্ধি, মাঠে ভালো ফলনের সম্ভাবনা এবং বাজারে আশাব্যঞ্জক মূল্য সেই সম্ভাবনাকেই আরো জোরালো করছে। তবে এই সম্ভাবনাকে স্থায়ী সাফল্যে রূপ দিতে হলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, পাটভিত্তিক শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন হলে সোনালী আঁশ আবারো রাজশাহীর কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে আশা করছেন তারা।


