যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনায় যেসব দেশ সম্মতি না দেবে, তাদের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে যদি অন্য দেশ আমাদের সঙ্গে না থাকে, তাহলে আমি তাদের ওপর শুল্ক বসাতে পারি।’
অবশ্য কোন কোন দেশ এই শুল্কের আওতায় পড়তে পারে সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমনকি গ্রিনল্যান্ড দখলে নিজের লক্ষ্য পূরণে তিনি কোন ধরনের আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করবেন সে বিষয়ও নিশ্চিত করেননি।
বিবিসির খবরে বলা হয়, গ্রিনল্যান্ড মূলত ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি স্বশাসিত অঞ্চল। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও অনেকেই গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়টি সমর্থন করছেন না।
ট্রাম্প বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এটি ‘সহজ’ কিংবা ‘কঠিন পথে’ অর্জন করব।’
ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে নিজের অটল চিন্তার কথা জানাচ্ছিলেন, ঠিক সে সময়ই গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানাতে মার্কিন কংগ্রেসের একটি দ্বিদলীয় প্রতিনিধি দল অঞ্চলটি সফর করেন।
১১ সদস্যের ওই দলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল- রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরাও ছিলেন। এ সময় তারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে ট্রাম্পের আহ্বান নিয়ে উদ্বেগ জানান। সফরে গ্রিনল্যান্ডের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা।
প্রতিনিধি দলের নেতা ডেমোক্র্যাট সেনেটর ক্রিস কুনস বলেন, ‘এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দের কথা শোনা এবং সেই মতামত ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের জানিয়ে “পরিস্থিতির উত্তাপ কমানো”।’
গ্রিনল্যান্ডের সংসদ সদস্য আয়াজা কেমনিৎস জানান, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক তাকে ‘আশাবাদী’ করেছে। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের বন্ধু দরকার। আমাদের মিত্র দরকার।’
হোয়াইট হাউসের অবস্থান এবং গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের অবস্থানের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা ম্যারাথন, কোনো ছোট দৌড় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে যে চাপ আমরা দেখছি, তা ২০১৯ সাল থেকেই চলছে। এখন সব শেষ হয়ে গেছে ভাবা সরলতা হবে।’
‘প্রায় প্রতি ঘণ্টায় পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। তাই যত বেশি সমর্থন পাওয়া যায়, ততই ভালো’, যোগ করেন তিনি।
গ্রিনল্যান্ডে জনসংখ্যা কম হলেও এটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং এই অঞ্চলের জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও আশেপাশের দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক সামরিক সদস্য স্থায়ীভাবে মোতায়েন আছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে গ্রিনল্যান্ডের এই অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ঘাঁটি স্থাপন করে মার্কিন প্রশাসন।
সে সময় থেকে ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে গ্রিনল্যান্ডে যত খুশি সেনা মোতায়েন করতে পারে। তবুও ট্রাম্প বলছেন, সম্ভাব্য রুশ বা চীনা হামলা প্রতিহত করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিকানা’ থাকা দরকার।

এদিকে ট্রাম্পকে সতর্ক করে ডেনমার্ক জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে ন্যাটোর অবসান ঘটতে পারে। ট্রান্স-আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোটটির সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র।
ন্যাটোর মূল নীতি হলো- বাইরের আক্রমণের ক্ষেত্রে সদস্যরা একে অপরকে সহায়তা করবে। কিন্তু কোনো সদস্য আরেক সদস্যের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করলে কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট করে জানায়নি জোটটি।
গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের ইউরোপীয় মিত্ররা অবশ্য তাদের পাশেই দাঁড়িয়েছে। তারা বলেছে, আর্কটিক অঞ্চল তাদের কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং এর নিরাপত্তা ন্যাটোর যৌথ দায়িত্ব হওয়া উচিত, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রও থাকবে।
এমন প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ তথাকথিত ‘রিকনিস্যান্স মিশনের’ অংশ হিসেবে সীমিত সংখ্যক সেনা গ্রিনল্যান্ডে পাঠিয়েছে।
অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডে ট্রাম্পের দূত জেফ ল্যান্ড্রি শুক্রবার ফক্স নিউজকে বলেন, ‘ডেনমার্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে কথা বলা। আমি বিশ্বাস করি, বিষয়টি এগোলে একটি চুক্তি হবেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়ে সিরিয়াস। তিনি তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।’
‘তিনি ডেনমার্ককে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কী চান। এখন বিষয়টি হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে একটি চুক্তি করা। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই স্বাগত জানানো একটি পক্ষ। আমরা কাউকে দখল করতে বা কোনো দেশের ওপর কর্তৃত্ব করতে যাই না’, যোগ করেন ল্যান্ড্রি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবসময় বলি, আমরা স্বাধীনতার প্রতিনিধি। আমরা অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি। আমরা সুরক্ষার প্রতিনিধি।’


