জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকারের ভেতরের লোকদের মধ্যে নতুন করে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ‘এস আলম’ এবং ‘সালমান এফ রহমান’ হওয়ার এক তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত ১৬ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাট ও দুর্নীতি হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও পরিবারকেই বিশাল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং সেই ঋণের টাকা তারা বিদেশে পাচার করে ঋণখেলাপি হয়েছে।
বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের সাধারণ প্রত্যাশা ছিল, দেশে এই সংস্কৃতি আর ফিরে আসবে না। কিন্তু বর্তমান সরকারের পরিস্থিতি ও আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, এই সরকারের আমলে ‘এস আলম’ বা ‘সালমান এফ রহমান’ কে হবেন, তা নিয়ে ভেতরে ভেতরে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। সংসদে বিরোধী দলের অনেক আলোচনা পাশ কাটিয়ে সরকার তার নিজের মতো করে আইন পাশ করেছে, ফলে এই আলোচনাকেও সরকার কতটুকু গুরুত্ব সহকারে নিবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এই অভিজ্ঞতার পরও দেশের স্বার্থে তারা একটি ‘ছায়া বাজেটের’ রূপরেখা তৈরি করতে যাচ্ছেন, যা হবে মূলত সংস্কারমুখী, বিনিয়োগমুখী এবং কর্মসংস্থানমুখী।
নাহিদ ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সরকার যদি ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য বজায় রাখত, তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হতো।
কিন্তু প্রথম অধিবেশনে সরকার ‘জুলাই সনদ’ ও ‘গণভোটে’ দেওয়া রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করেনি। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের যে বড় যাত্রা শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে দেশ আরও দুই ধাপ পিছিয়ে গেছে।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশিরা বিনিয়োগ করার আগে দেশীয় ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করা জরুরি। দেশীয় ব্যবসায়ীদের যদি বিনিয়োগের আস্থা না থাকে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না–এটাই স্বাভাবিক।
সরকারের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, একটি নির্বাচিত সরকার এলেই বিদেশি বিনিয়োগের জোয়ার আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সম্পর্ক স্থাপন এবং বাংলাদেশে তহবিল আনার ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা দেখিয়েছেন, বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত কোনো একটা দেশ থেকে ন্যূনতম দাওয়াত পর্যন্ত পায়নি, এমনকি আইএমএফের ঋণও তাদের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেবল ব্যবসায়ীদের নিজের উপদেষ্টা কমিটিতে রেখে দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বাস অর্জন করা যায় না। বড় বড় করপোরেট গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক লবিংয়ের মাধ্যমে এমন ঋণ দেওয়া বন্ধ করতে হবে যা তারা আর শোধ করে না।
অথচ দেশের একজন ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র ৫ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তার কোমরে দড়ি বেঁধে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বৈষম্য দূর করে সৎ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি শিল্প বিস্তারের ওপর জোর দিতে হবে।
সবশেষে অর্থনৈতিক সংস্কারে সরকারকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কোনো সরকারের পক্ষেই তা এককভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল দেশ এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে।


