রাতের আঁধারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইন প্রতিরোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাশে দাঁড়িয়েছেন পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা। হাতে টর্চ লাইট, লাঠি আর বাঁশি নিয়ে তারা রাতভর পাহারা দেন নিজ এলাকার সীমান্ত। উদ্দেশ্য- অনুপ্রবেশ ও ভারতীয় নাগরিকদের পুশইন প্রতিরোধ।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় পুশইনের অভিযোগ ও অনুপ্রবেশের আশঙ্কা বাড়ার পর সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার মানুষের মধ্যে সতর্কতা আরও বেড়েছে। ফলে বিভিন্ন সীমান্তের গ্রামের বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাতভর টহল দিচ্ছেন। কেউ অবস্থান নিয়েছেন কাঁটাতার সংলগ্ন গাছের নিচে, কেউ বাজারের দোকানের সামনে আবার কেউ চা বাগানের ভেতরে কিংবা সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে নজরদারি চালাচ্ছেন।
বুধবার রাতে জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া ও একই উপজেলার তিরনইহাট ইউনিয়নের ইসলামবাগ এলাকার সরজমিনে এমনই চিত্র দেখা যায়। এ সময় স্থানীয় যুবকসহ নানা বয়সী মানুষকে বিজিবির পাশাপাশি সীমান্তে পাহারা দিতে দেখা যায়।
তারা জানান, গত কয়কদিন ধরেই কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে স্থানীয়রা রাতভর পাহারার দিচ্ছেন। বিপদের আভাস পেলেই বাঁশি বাজিয়ে অন্যদের সতর্ক করা হয়। এরপর সবাই দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমান্তে কোন সন্দেহজনক ব্যক্তিকে দেখলেই তারা সঙ্গে সঙ্গে বিজিবিকে খবর দেন। এভাবেই সীমান্তে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে বিজিবি সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামে প্রচার-প্রচারণা, সচেতনতামূলক মাইকিং এবং উঠান বৈঠক করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে যৌথভাবে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় মানুষের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
এরইমধ্যে জেলার সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে ১০ জনকে পুশইন চেষ্টার ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা জন্ম দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে পুশইনের চেষ্টা করা ওই ব্যক্তিদের দেখতে পান এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে জানান।
পরে বিজিবির ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে সীমান্তে অবস্থান নিলে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি এবং ভারতীয় সীমান্ত এলাকাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
পুশইনের বিষয়ে কথা হয় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকার যুবক খাইরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সীমান্তের এলাকার মানুষরা হোসেনের ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছি। আমরা কোনভাবেই পুশইন মেনে নেব না। তাই আমরা বিজিবির সঙ্গে সীমান্তে পাহারা দেই। যারা দিনে সময় পায় দিনে, আর যারা রাতের সময় পাই রাতে সীমান্তে পাহারা দেই।’
বারেকুল ইসলাম নামে আরেক স্থানীয় বলেন, ‘আমরা সীমান্তের মানুষ শান্তিপ্রিয়। আমরা কোনোভাবেই ভারতীয় মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেব না। তাই আমরা কষ্ট হলেও দেশের স্বার্থে সীমান্তে টহল দেই।’
একই কথা বলেন ইসলামবাগ এলাকার যুবক রাহাত আলী। বলেন, ‘আমরা দিনে কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পর রাতের খাবার খেয়ে সীমান্ত পাহারা দিতে বের হই। আমাদের সবার কাছে লাঠি, টর্চলাইট ও বাঁশি থাকে একটি করে। বাঁশি বাজলেই আমরা বুঝে নেই কোথাও সমস্যা হয়েছে। পরে সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিজিবি ও স্থানীয়রা সেখানে উপস্থিত হই এবং বিষয়টি তদন্ত করি।’
তেঁতুলিয়ার বোয়ালমারী এলাকার সাব্বির হোসেন জানান, তাদের সবাইকে বিজিবি বাঁশি দিয়ে গিয়েছে। সীমান্তে কোন ঘটনা ঘটলে বিজিবির কানে বাঁশি বাজার শব্দ শোনা মাত্রই তারা ছুটে আসেন।
জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলার মোট সীমান্ত এলাকার দৈর্ঘ্য ২৭৭ দশমিক ৯১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে পঞ্চগড় ব্যাটালিয়ন (১৮ বিজিবি) দায়িত্ব পালন করছে ১৩৫ দশমিক ৫৯১ কিলোমিটার, ঠাকুরগাঁও ব্যাটালিয়ন (৫০ বিজিবি) ১৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং নীলফামারী ব্যাটালিয়ন (৫৬ বিজিবি) ১২৮ দশমিক ৯২৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে।
পঞ্চগড়-১৮ ব্যটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ কায়েস বলেন, ‘সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও পুশইন ঠেকাতে আমরা সব সময় তৎপর রয়েছি। অবস্থানে পাশাপাশি টহল জোরদার করেছি। স্থানীয় মানুষদের সচেতন করছি এ বিষয়ে। স্থানীয় মানুষরাও আমাদের অনেক সহযোগিতা করছেন। রাত জেগে গ্রামবাসী ও পাহারা দিচ্ছেন আমাদের সঙ্গে।’


