ক্ষতিগ্রস্ত ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট’ (এফএসআরইউ) মেরামত করে আবার চালু করা হলেও বাংলাদেশে কাটছে না গ্যাসের সংকট। উৎপাদনের হিসাব, সরকারি কর্মকর্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কূপ থেকে যে পরিমাণ গ্যাস তোলা সম্ভব হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত ফুরিয়ে আসছে দেশের পুরোনো গ্যাসফিল্ডগুলোর উৎপাদন।
দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটিতে প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দেওয়ায় সংকট এখন চরমে পৌঁছেছে। স্বাভাবিক সময়ে দিনে যেখানে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ২১৫ কোটি ঘনফুটে। ফলে সারা দেশের বাসাবাড়ি, কারখানা আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে এক গভীর বিপদের কথা। তা হলো–বিদ্যমান গ্যাসফিল্ডগুলোর উৎপাদন দিন দিন কমলেও, নতুন গ্যাস খোঁজা বা কূপ খননের কাজ সেই অনুযায়ী একদমই এগোয়নি।
পেট্রোবাংলার দৈনিক হিসাব দেখলেই বোঝা যায়, কীভাবে বছরের পর বছর দেশের গ্যাস উৎপাদন কমে চলেছে।
২০২২ সালের শুরুর দিকে গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে দিনে গড়ে প্রায় ২২৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২২৪ কোটি ঘনফুটে, ২০২৪ সালে ২০৫ কোটি ঘনফুটে এবং ২০২৫ সালে তা আরও নেমে ১৯৩ কোটি ঘনফুটে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, গত তিন বছরেই নিজেদের গ্যাসফিল্ড থেকে দৈনিক প্রায় ৩৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কমেছে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি উৎপাদন কমেছে সবচেয়ে বড় গ্যাসফিল্ড বিবিয়ানা, জালালাবাদ, তিতাস ও হবিগঞ্জ থেকে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এফএসআরইউ মেরামতের কাজ প্রায় শেষ। তবে এটি ঠিক কবে থেকে আবার চালু হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দিনের কথা জানাতে পারেননি।
পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা মনে করেন, আসল বড় চ্যালেঞ্জ হলো দিন দিন পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়া। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘দেশের গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে বহু বছর ধরে গ্যাস তোলা হচ্ছে। মাটির নিচের প্রাকৃতিক সম্পদ চিরকাল থাকবে না। তা ছাড়া অনেক কূপ বেশ পুরোনো হয়ে গেছে। তাই মজুত কমার পাশাপাশি উৎপাদনও কমে আসছে।’
পেট্রোবাংলার নতুন তথ্যেও বড় ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমার স্পষ্ট ছবি দেখা যায়। যেমন—শেভরনের তিন গ্যাসফিল্ড থেকে জানুয়ারির শুরুতে প্রতিদিন গড়ে ৯৫ থেকে ৯৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেত দেশ। জুলাইয়ের ২০ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে তা কমে দাঁড়ায় ৮৮ থেকে ৮৯ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসে দিনে প্রায় ৭ থেকে ১০ কোটি ঘনফুট উৎপাদন কমেছে। একই সময়ে সরকারি গ্যাসফিল্ডগুলো থেকেও সরবরাহ কমেছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য পরীক্ষা করলে দেখা যায়, প্রতি বছরের শুরুতেই বড় গ্যাসফিল্ডগুলোর উৎপাদন অনেকটা কমেছে। শেভরন পরিচালিত জালালাবাদ গ্যাসফিল্ডে শতকরা হিসাবে পতন সবচেয়ে বেশি। ২০২১-২২ সালে এই গ্যাসফিল্ডে দৈনিক ২১ কোটি ১৪ লাখ ঘনফুট গ্যাস মিললেও ২০২৪-২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৬২ লাখ ঘনফুটে। অর্থাৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।
পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন কমেছে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসফিল্ড বিবিয়ানায়। এই সময়ে এখানে দৈনিক উৎপাদন ১১৬ কোটি ২৮ লাখ ঘনফুট থেকে কমে ৯৭ কোটি ৩৭ লাখ ঘনফুটে নেমেছে, যা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ পতন।
বিজিএফসিএল-এর হবিগঞ্জ গ্যাসফিল্ডে উৎপাদন ১৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৮১ লাখ ঘনফুটে। এখানে উৎপাদন কমার হার ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। তাদের অপর গ্যাসফিল্ড তিতাসে উৎপাদন ৪০ কোটি ৩৯ লাখ ঘনফুট থেকে কমে হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৭ লাখ ঘনফুট। বাখরাবাদে উৎপাদন ৩ কোটি ৫৫ লাখ ঘনফুট থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুটে। আর টাল্লো পরিচালিত বঙ্গোরায় উৎপাদন ৪ কোটি ২৭ লাখ ঘনফুট থেকে কমে হয়েছে ৩ কোটি ৬৭ লাখ ঘনফুট।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যেখানে দেশীয় গ্যাসফিল্ড থেকে দিনে ২০ কোটি ৪৭ লাখ ঘনফুট গ্যাস আসত, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তা কমে দাঁড়ায় ১৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে। অর্থাৎ এই অল্প সময়েই দৈনিক সরবরাহ কমেছে প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ ঘনফুট।
২০২০ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় উৎসের সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, যা পরেও কমতে থাকে। অন্যদিকে, এফএসআরইউ বন্ধ থাকায় সাময়িকভাবে দিনে আরও সাড়ে ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার আগেই যে ঘাটতি ছিল, তা আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু দেশীয় গ্যাসফিল্ড আর আমদানি মিলিয়ে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট।
গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের গ্যাসফিল্ডগুলোতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস বাকি আছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মোট উত্তোলনের যোগ্য ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে ইতিমধ্যে ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট তুলে ফেলা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, নতুন কোনো গ্যাসফিল্ড পাওয়া না গেলে এবং এখনকার মতো দিনে ১৭ কোটি ঘনফুট হারে গ্যাস তোলা হতে থাকলে, এই অবশিষ্ট গ্যাস দিয়ে সর্বোচ্চ ১২ বছর চলা সম্ভব।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, উৎপাদন কমার ধাক্কা সামলাতে পেট্রোবাংলা বর্তমানে আটটি কূপ খনন করছে। এর মধ্যে পাঁচটি খনন করছে বাপেক্স এবং বাকি তিনটি করানো হচ্ছে বাইরের ঠিকাদার দিয়ে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার স্থলভাগে একটি এলএনজি টার্মিনাল তৈরি ও ধাপে ধাপে কূপ খনন চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন কমার গতির তুলনায় এই আটটি কূপ খননের পরিকল্পনা খুবই সামান্য।
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, নতুন গ্যাসফিল্ড খুঁজে বের না করলে পুরোনো গ্যাসফিল্ড থেকে উৎপাদন কমতেই থাকবে। তার ভাষায়, ‘পুরোনো গ্যাসফিল্ড থেকে সময়ে সময়ে উৎপাদন কমা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। নতুন গ্যাসফিল্ড আবিষ্কৃত না হলে এখন যেসব গ্যাসফিল্ড আছে সেগুলোর উৎপাদন নামতেই থাকবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক মনে করেন, বাংলাদেশে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা নেই-তা নয়। বরং মূল সমস্যা হলো গ্যাস খোঁজার কাজে চরম ধীরগতি। তিনি বলেন, ‘যে গতিতে কূপ খনন করা দরকার, বাংলাদেশ তা করছে না। অন্য অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকা সত্ত্বেও খুব কম কূপ খনন করা হচ্ছে।’
তার মতে, মাত্র আটটি কূপ খনন করে দেশের বড় এই সংকটে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য ৮টি কূপের পরিকল্পনা একেবারেই নগণ্য। আমাদের অন্তত ২০ থেকে ৩০টি কূপ খননের বড় কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার।’
বাংলাদেশে কূপ খননের গতি এত কম হওয়ার মূল কারণ পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের আধুনিক যন্ত্রপাতি, ড্রিলিং রিগ ও অভিজ্ঞ লোকবলের অভাব। সেই সঙ্গে সরকারি নিয়মে প্রকল্পের প্রস্তাব অনুমোদন, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ ও কেনাকাটার জটিল নিয়মের কারণে সবকিছু এগোয় খুব ধীরগতিতে।
অধ্যাপক বদরুল ইমাম সতর্ক করে বলেন, ‘আজ কূপ খনন বা সাগরে অনুসন্ধান শুরু করলেই কালই তার ফল মিলবে না। এর কোনো চটজলদি সমাধান নেই। আপনি আজ সিদ্ধান্ত নিয়ে কালই গ্যাস উৎপাদন শুরু করতে পারবেন না। এটি একটি একটানা প্রক্রিয়া। এই কাজ যখন ধারাবাহিকভাবে চলবে, তখনই ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়ানো যাবে।’
ঘাটতি মেটাতে সরকার এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং দেশের ভেতরে অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে ১৩ বছরের চুক্তিতে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া গত ২৮ জুলাই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকট মেটাতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস খোঁজার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
তবে বঙ্গোপসাগরে সত্যি কতটা ব্যবহারযোগ্য তেল বা গ্যাস রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তা ছাড়া গ্যাস পাওয়া গেলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গ্যাসফিল্ড তৈরি, পাইপলাইন বসানো ও জাতীয় গ্রিডে তা যুক্ত করতে কয়েক বছর লেগে যাবে।
অন্যদিকে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়েও এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, দেশে গ্যাস রূপান্তরের যে টার্মিনাল আছে, সেগুলো এখনই নিজেদের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চলছে। আরও বেশি আমদানি করতে হলে নতুন অবকাঠামো লাগবে, যা বর্তমানে নেই।
তা ছাড়া বিদেশের গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভর করলে বিশ্ববাজারে দাম ওঠানামা ও সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকি থাকে। ২০১৮ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কাতারএনার্জি বাংলাদেশকে এলএনজি দিচ্ছে। কিন্তু ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে ভবিষ্যতে চুক্তি অনুযায়ী সব গ্যাস সময়মতো আসবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, আগামী তিন থেকে চার বছরে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে চুক্তির মাত্র অর্ধেক পরিমাণ এলএনজি।
বিশেষজ্ঞদের কথা, বড় পরিসরে আর ধারাবাহিকভাবে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ হাতে না নিলে, মেরামত করা এফএসআরইউ চালু হওয়ার পরও বাংলাদেশের এই গ্যাস সংকট দিন দিন আরও তীব্র হতে থাকবে।


