সরকারি ওয়েবসাইটগুলো থেকে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলের তথ্য–উপাত্ত সরিয়ে ফেলছে অন্তর্বর্তী সরকার।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর ২৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইট এরই মধ্যে আগের সরকারের রেকর্ড ‘পরিষ্কার’ করেছে। অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগও ফাইল মুছে ফেলছে বা ব্লক করে দিচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই ওয়েবসাইট থেকে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবুর রহমানের প্রোফাইল, ছবি ও ভিডিও সরানোর কাজ শুরু হয়। কিন্তু বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এখনো আগের সরকারের অনেক তথ্য রয়ে যাওয়ায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-গভর্নেন্স শাখা ২৪ এপ্রিল একটি সার্কুলার জারি করে নির্দেশ দেয় সব রেকর্ড ‘সম্পূর্ণভাবে অপসারণের’।
সার্কুলারে উপসচিব শেখ জোবায়ের আহমেদ মন্তব্য করেন, ‘অপ্রয়োজনীয় ও প্রশংসামূলক তথ্য, ছবি ও ভিডিও এখনো অনেক ওয়েবসাইটে রয়েছে, যা একদিকে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করছে অন্যদিকে সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে।’
সার্কুলারে সব দপ্তর-মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত–ওয়েবসাইট ‘আপডেট’ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যার অর্থ আগের তথ্য মুছে ফেলা।
একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পরিকল্পনা, কার্যক্রম, সাফল্য ও বাজেটের তথ্য থাকে এবং তা আগের বছরের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এসব রেকর্ড মুছে ফেলা তথ্য অধিকার আইনের (আরটিআই) লঙ্ঘন। কারণ, এতে নাগরিক, সাংবাদিক, গবেষকদের সরকারি নথিতে প্রবেশের অধিকার ব্যাহত হয়।
টাইমস অব বাংলাদেশ ৫৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে দেখেছে, অনেক সাইট একেবারে খালি। উদাহরণ হিসেবে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, রেলপথ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইটে কোনো তথ্য নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগও খালি পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের পাবলিক বিভাগ ও ব্যক্তিগত বিভাগেও কোনো তথ্য নেই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগেও হাসিনা সরকারের কোনো রেকর্ড নেই।
পোস্টস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের বার্ষিক প্রতিবেদন ওপেন করলে ‘৪০৪’ দেখায়, ‘The page you are looking for doesn’t exist or has been moved.’
বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও আগের সরকারের কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন নেই।
এক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট তত্ত্বাবধায়ক এক সিস্টেম অ্যানালিস্ট বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশ এলে সেটা মানা ছাড়া উপায় নেই। অফিস শেষে রাতেও আমাকে ফোন দিয়ে আগের তথ্য মুছে ফেলতে বলা হয়েছে।’
বিদ্যুৎ বিভাগের সিস্টেম অ্যানালিস্ট হুমায়ুন কবীর টাইমসকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা তাকে আগের সব তথ্য নামিয়ে ফেলতে বলেন। ‘নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো ডিলিট করেছি।’ তবে ৩০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এখনো আগের সরকারের বার্ষিক প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে রেখেছে।
সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, যিনি গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম সংগঠক, তার মন্ত্রণালয়ের সাইটে এখনো আগের সরকারের বার্ষিক প্রতিবেদন রয়েছে।
আরেক সংগঠক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তদারক করছেন। তার অধীন দুটি মন্ত্রণালয়ের সাইটেও আগের রেকর্ড মুছে ফেলা হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সিস্টেম অ্যানালিস্ট শফিকুল ইসলাম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সিস্টেম অ্যানালিস্ট এএসএম হোসনে মোবারক বলেন, ‘তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি, তাই আগের রেকর্ড রেখেছেন।’
দুই উপদেষ্টা এবং ক্যাবিনেট সেক্রেটারি দাবি করেছেন, বার্ষিক প্রতিবেদন সরানোর বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।
উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আগের সরকারের বার্ষিক প্রতিবেদন নেই—এ তথ্য তার জানা ছিল না। আরেক উপদেষ্টা ওয়াহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ কোনো দিনই বার্ষিক প্রতিবেদন সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ক্যাবিনেট সেক্রেটারি শেখ আবদুর রশিদ বলেন, ‘আমরা (কাউকে) বার্ষিক প্রতিবেদন সরাতে বলিনি।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার যদি কোনো অংশকে অপ্রয়োজনীয় বা দেশের জন্য ক্ষতিকর মনে করে, তবে সেই অংশ মুছে ফেলতে পারে, কিন্তু পুরো প্রতিবেদন নয়।
তিনি বলেন, ‘তথ্য অধিকার আইনে সরকারকে তথ্য স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। সরকার যদি তা না করে, তাহলে সরকার নিজেই আইন ভঙ্গ করছে।’ ‘সরকার যত দ্রুত সম্ভব ডিলিট করা বার্ষিক প্রতিবেদন ফিরিয়ে আনবে এবং যেসব অংশ আপত্তিকর মনে হয় সেগুলো ঝাপসা করে দেবে,’ যোগ করেন তিনি।


