চার বছর পরপরই বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে এক অদ্ভুত জ্বর–‘বিশ্বকাপ জ্বর’। ২০২৬-এর এই আসরে জ্বরের তাপমাত্রা যেন আরও চড়া। ৪৮ দেশের অংশগ্রহণ, মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও চলছে জার্সি-পতাকা নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি; অফিস-বাসাবাড়ি-ভার্সিটির হল থেকে গ্রামের চায়ের দোকান—সবখানে একই দৃশ্য। অথচ এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ নামের কোনো দল নেই, কবে আসবে তার আভাসও নেই।
যে দেশ, যে দল, যে খেলোয়াড়দের জন্য এত পাগলামি, তারা এদেশের কারও নামই জানে না, চেনেও না। তবু এদের সমর্থন করতেই রাত জাগা, অর্থ-শ্রম-সময়-মেধা উজাড় করে দেওয়া, তর্কে জড়িয়ে মারামারি পর্যন্ত করা—পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন স্ববিরোধী। প্রশ্ন জাগে, এই উন্মাদনা কি আসলে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা, নাকি হুজুগে গা ভাসানো? নাকি পুরোটাই বহুজাতিক পুঁজিপতিদের বাণিজ্যিক ফাঁদ, যেখানে আমরা শুধুই অবুঝ ক্রেতা?
সমাজতাত্ত্বিকভাবে একে বলা যায় ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বা গড্ডালিকা প্রবাহ—সবাই করছে, তাই আমিও করব। বিশ্বকাপের সময় তৈরি হয় এক সামষ্টিক উন্মাদনা। অফিসে সহকর্মী, ভার্সিটির বন্ধু, পাড়ার আড্ডার সবাই যখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি নিয়ে কথা বলে, তখন না জানলে নিজেকে ‘বোকা’ মনে হয়। এই ফোমো (ফিয়ার অব মিসিং আউট) থেকেই অনেকে দল বেছে নেন, জার্সি কেনেন, রাত জেগে খেলা দেখেন। কিন্তু এ ভালোবাসা অন্তর থেকে নয়, বরং দলবদ্ধতার সামাজিক চাপ থেকেই আসে। ব্যক্তি এখানে নিজের পছন্দ নয়, বরং দলের পছন্দকেই নিজের করে নেয়—ঠিক যেন গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়া।
বিশ্বকাপ এখন আর নিছক খেলা নয়, বহু বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক শিল্প। ফিফা, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান, পোশাক প্রস্তুতকারী জায়ান্ট কোম্পানিগুলো নিখুঁত কৌশলে তৈরি করে ‘আমার দল’, ‘আমার হিরো’, ‘আমার গর্ব’ নামক আখ্যান। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসির জার্সি কেনাটা শুধু সমর্থন নয়, ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য।
টিভি চ্যানেলের ঘণ্টার পর ঘণ্টা টক শো, আবেগঘন ভিডিও প্যাকেজ, বিজ্ঞাপনে খেলোয়াড়দের মহিমান্বিত রূপায়ণ—সবই এই ‘ভালোবাসা’কে পণ্যে পরিণত করে। পশ্চিমা কোনো কোম্পানির তৈরি করা জার্সি পরে ঢাকার রাস্তায় মিছিল করাটা আসলে সে কোম্পানির ফ্রি অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করারই নামান্তর। আমরা ভাবছি দলকে ভালোবাসি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা ভোগবাদী সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে উঠছি।
নিজের দেশ ফুটবলে কিছুই করতে পারেনি–এই হতাশা কাটাতেও অনেকে অন্য দেশের সফল জাতীয় দলকে আপন করে নেন। ‘আমি আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করি’–এই কথাটি বলার মধ্যে এক ধরনের জয়-ভাগ বসার তৃপ্তি কাজ করে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘বাস্কিং ইন রিফ্লেক্টেড গ্লোরি’ অর্থাৎ, অন্যের সাফল্যে ডুবে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করা। এ এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা, যেখানে আমরা নিজেদের ব্যর্থতা ভুলে দূরের কারও জয়কে নিজের জয় ভাবতে শুরু করি। অথচ সেই জয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র অবদান নেই, বরং শুধু সময় আর ঘুমের অপচয়ই সার হয়।
রাত জেগে খেলা দেখা, অফিসে ক্লান্ত শরীরে কাজে ব্যাঘাত, স্টেডিয়ামের আদলে ঘর সাজানো, পতাকা-জার্সির পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ–সব মিলিয়ে বিশাল এক অপচয়। অথচ যে আবেগ, যে অধ্যবসায় দিয়ে আমরা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের খেলা বিশ্লেষণ করি, সেই একই মেধা যদি নিজেদের ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়নে, তৃণমূলের প্রশিক্ষণে কিংবা নিজেরাই মাঠে গিয়ে অনুশীলনে ব্যয় করতাম, তাহলে হয়তো বাংলাদেশেরও কোনো একদিন বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখা যেত।
দুঃখজনক সত্য হলো, আমরা বিদেশি দলের খেলা নিয়ে লম্বা তক্কো-গপ্পো করি, অথচ নিজেরা কেউ মাঠে গোল দেবার চেষ্টা করি না। ভালোবাসা যদি খেলার প্রতি সত্যিই থাকত, তবে তা খেলা দেখায় নয়, খেলায় অংশগ্রহণেই প্রকাশ পেত।
এই উন্মাদনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিক হলো প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ বা একতরফা মানসিক সম্পর্ক। মেসি বা নেইমারের জীবনযাপন, সংসার, অনুশীলন ভিডিও আমরা নিবিড়ভাবে ফলো করি, তাদের সুখ-দুঃখকে আপন করে নিই, অথচ তারা আমাদের অস্তিত্বই জানে না। আমরা ভাবি, ‘আমাদের’ নেইমার দারুণ খেলেছে, অথচ সেই ‘আমাদের’ নেইমারের কাছে আমি-আপনি একেকজন অচেনা, দূর দেশের অগণিত অজানা মুখের ভিড়েরই অংশ মাত্র। অথচ এ অচেনাকে নিয়েই তর্কে জড়িয়ে পড়ি, এমনকি মারামারি পর্যন্ত করি, যা পরিণতিতে এক অবাস্তব মানসিক আসক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। এই মানসিক চাপ এতটাই প্রকট যে মিশরের হারে অকল্পনীয় যাতনায় বাংলাদেশের নোয়াখালীতে মামলা হয় রেফারি ও ফিফার শাস্তি চেয়ে!
কোনো বড় কোম্পানি যে দলকে ‘শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে বাজারজাত করে, সেই দলের সমর্থক হয়ে অন্য দলের সমর্থকের সঙ্গে ঝগড়া, এমনকি মারামারি–এ কেবল হুজুগের চরম রূপ। নিজেদের জীবনে কোনো অর্জন নেই, কিন্তু একটি বিদেশি দলকে ‘আমার’ করে নেওয়ার মাধ্যমে নিজেকে ‘বিজয়ী’ ভাবতে গিয়ে এ সহিংসতা জন্ম নেয়। মজার ব্যাপার, এই সহিংসতার বলি হয় এদেশের মানুষ, অথচ যে দেশের জন্য প্রাণ যাওয়ার জিদ, সে দেশের মানুষের কাছে আমরা নগণ্য পরিসংখ্যানও নই। তাই এই সমর্থন আসলে অনুৎপাদনশীল, অলাভজনক এবং সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় আত্মপ্রতারণা।
ফিফা বিশ্বকাপ এক অনবদ্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতা–এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেটি উপভোগ আর হুজুগে গা ভাসানোর মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে বিপুল আবেগ, তা যদি এই গড্ডালিকা প্রবাহ ও বাণিজ্যের ফাঁদ থেকে বের করে আনা যায়, তাহলেই হয়তো সেই শক্তি দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করতে কাজে লাগবে। দূরের দেশের অচেনা খেলোয়াড়ের পেছনে না ছুটে, নিজের পায়ে বল নিয়ে মাঠে নামার, স্থানীয় প্রতিভা খোঁজার, নিজেদের ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ার সময় এখনই। নইলে আমরা প্রতি চার বছর পরপর কেবলই বহুজাতিক পুঁজির বানানো আতশবাজির উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগব–এক চরম আত্মপ্রবঞ্চনার ভেতর দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতাকেই আরও মজবুত করব।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ


