টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকট ও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের চট্টগ্রামে মানবিক সংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর এলাকায় দেড় থেকে দুই ফুট পানি উঠে যায়। এতে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়ক এবং কক্সবাজারের সঙ্গে একমাত্র সড়ক যোগাযোগ হুমকির মুখে পড়ে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের একটি দলের সঙ্গে ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর প্রতিনিধি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা পরিদর্শন করেন। সেখানে দেখা গেছে, পুরো জনপদ যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ সড়কগুলো কাদার নিচে তলিয়ে গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ খাদ্য, নিরাপদ পানি ও চিকিৎসার তীব্র সংকটে পড়েছেন।
চট্টগ্রামে গত এক সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নগরীর সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বৃষ্টিপাত। যদিও শুক্রবার বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমেছে, তবে এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৫৪ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সাতকানিয়া ও পার্শ্ববর্তী লোহাগাড়ার প্রায় কোনো শুষ্ক জায়গা অবশিষ্ট নেই, সব পথই পানির নিচে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর প্রায় পুরো এলাকাই এখন পানির নিচে। এ ছাড়া চন্দনাইশ, আনোয়ারা, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ির বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় সাত লাখ মানুষ পানিবন্দি, যার মধ্যে অন্তত এক লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। উদ্ধারকাজে উপযোগী নৌযানের অভাব রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে স্পিডবোট চাওয়া হয়েছে।
দুর্গতদের জন্য খাবার, নিরাপদ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ ৬০০-এর বেশি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সাতকানিয়ার ঢেমশা ইউনিয়নে ৩৫ বছর বয়সী হালিমা বেগম তার ঘরে আটকা পড়েছেন। কাছেই একটি ট্রাক থেকে স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার বিতরণ করলেও গভীর পানি পেরিয়ে সেখানে যাওয়ার উপায় ছিল না তার।
ঢেমশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের বলেন, সড়ক ভেঙে যাওয়ায় ত্রাণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী হাসপাতালে যেতে না পেরে মারা যান।
পার্শ্ববর্তী বাঁশখালীর বাহারছড়ায় শুক্রবার সকালে মিরাজ ও আশিক নামে দুই শিশু বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। পশ্চিম গুণাগরী, কালীপুর ও বাহারছড়ায় কোমর থেকে বুক সমান পানি বিরাজ করছে। পরিবারগুলো স্কুল ও বহুতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছে, অনেকে আংশিক নিমজ্জিত ঘরেই আটকা পড়েছেন।
গুণাগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৩০০ বাড়ি পানির নিচে। শতাধিক মানুষ সেখানে ‘লাবুর দোকান’ নামে পরিচিত একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় ভিড় করেছেন। শিশুরা কংক্রিটের মেঝেতে ঘুমাচ্ছে এবং পরিবারগুলো সামান্য খাবার নিয়ে দিন পার করছে।
৭০ বছর বয়সী ফার্মাসিস্ট আব্দুল গফুর বলেন, তিনি জীবনে কখনো এমন বন্যা দেখেননি। চার দিন ধরে সেখানে বিদ্যুৎ নেই। পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেওয়া ৬৫ বছর বয়সী আহমদ হোসেন বলেন, জীবনে অনেক বন্যা দেখেছেন, কিন্তু এবার নিজেকে এতটা অসহায় কখনো মনে হয়নি।
ফারাসা বেগম তার সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে কেবল পরনের কাপড় নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন। আরেক বাসিন্দা সাদিয়া সুলতানা সন্তান প্রসবের অপেক্ষায় আছেন, কিন্তু সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে যাওয়ার কোনো নিরাপদ পথ নেই।
জেলা প্রশাসন জরুরি সহায়তা হিসেবে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রান্নাঘর ও জ্বালানি পানির নিচে থাকায় তাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রান্না করা খাবার।
দুর্যোগের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে কক্সবাজারেও। জেলার চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ার সময় চকরিয়ায় নৌকাডুবির ঘটনায় দুই কিশোরী বোন—হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা ও শাওরিন মনি—মারা যায়।
পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে পাহাড় ধস, দেয়াল ধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম নিচু ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে পার্বত্য জেলাগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে। খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে বাদা নালা, লেমুছড়ি ও মহালছড়ির কিছু এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে। দিঘীনালা-লংগদু, দিঘীনালা-বাঘাইছড়ি, দিঘীনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে যান চলাচল আবার শুরু হয়েছে।
বান্দরবানে পাঁচ দিন পর চার ঘণ্টার মতো রোদের দেখা মিলেছে এবং সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি কমছে। তবে কৃষিবিদ কাই চিন সতর্ক করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে শসা, ধুন্দল, করলা, পটল ও কাঁকরোলের গোড়া পচে নষ্ট হতে পারে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সামিউল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত এক নোটিশে জানানো হয়েছে, ভারী বর্ষণে যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বান্দরবানে পর্যটকদের ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা ১২ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
রাঙামাটির সাজেকে আটকে পড়া ৪১১ জন পর্যটকই সেনাবাহিনী ও স্থানীয়দের সহায়তায় নৌকা ও বাঁশের ভেলা দিয়ে প্লাবিত সড়ক পার হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরেছেন। তবে সাজেক, ঝরনা ও অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ আপাতত স্থগিত রয়েছে।
এদিকে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে ও নদীর পানি উপচে ২২টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, খোয়াই নদীর বাঁধের দুটি পয়েন্ট দিয়ে পানি ঢুকছে, যার একটিতে প্রায় ১০০ মিটার অংশ ধসে গেছে। তীব্র স্রোতের কারণে সংস্কার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মৌলভীবাজার সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়ায় পানি প্রবেশ করেছে এবং মনু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। সুনামগঞ্জের পাঁচটি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের চারটিতেই পানি বেড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক করেছে যে, উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে অন্যান্য নদীও দ্রুত ফুলে ফেঁপে উঠতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে ঝুঁকির মাত্রা বেশি থাকবে। সাঙ্গু, মাতামুহুরী, খোয়াই, মনু ও কুশিয়ারা নদীর পানি বেশ কয়েকটি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পানি ধীরে ধীরে কমলেও গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি বিপৎসীমা পেরিয়ে ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিচু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এ ছাড়া সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভোগাই-কংস নদীও উপচে পড়তে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম বড়ুয়া ‘টাইমেস’কে জানান, পাঁচটি নদীর ৯টি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে এবং আরও ৯টি নদী সতর্কাবস্থায় আছে। লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে। তিস্তা নদী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং ধরলা ও দুধকুমার নদী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে, যা কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের নিচু এলাকাগুলোকে সাময়িকভাবে প্লাবিত করতে পারে।
তবে পাহাড়ি এলাকার নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়লেও বৃষ্টি থামলে এক বা দুই দিনের মধ্যে নেমে যায়, তাই দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কোনো তাৎক্ষণিক আশঙ্কা নেই বলে জানান বড়ুয়া।
এদিকে দেশের বিভিন্ন শহরেও জলাবদ্ধতা মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকাকে ব্যাহত করছে।
জামালপুরে ভারী বৃষ্টির পর পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। স্থায়ী সমাধানের দাবিতে বৃহস্পতিবার গেটপাড় এলাকায় বাসিন্দারা তিন ঘণ্টা রেলপথ অবরোধ করেন।
চন্দ্রা এলাকার মাইশা বিন্তে মাজেদ জানান, ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় পানিবাহিত রোগ ও সাপের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ইজি-বাইক চালক শান্ত বলেন, মানুষ ঘর থেকে না বের হওয়ায় তাদের আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
খুলনা মহানগরের নিচু এলাকাগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম রিকশাচালক হাসান আলী বলেন, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত তিনি মাত্র দুজন যাত্রী পেয়েছেন। নিরালা এলাকার ফল বিক্রেতা সোহেল জানান, বিক্রি একেবারে কমে গেছে এবং ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাতক্ষীরার মাশখোলা গ্রামের শাহানারা বেগম জানান, তার রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়েছে এবং আরও বৃষ্টি হলে ঘর তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আছেন। ভ্যানচালক কার্তিক দাস জানান, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার পরিবার চাল-ডাল কেনা বন্ধ করে দিয়েছে, আর দিনমজুর মোখসেদ আলী দুই দিন ধরে কোনো কাজই পাননি।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের খাদ্য মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোও সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি যেসব স্থানে বৃষ্টি কমেছে, সেখানেও ক্ষুধা, রোগ, বিচ্ছিন্নতা ও নতুন করে বন্যার ঝুঁকির মুখে থাকা লাখো মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা)


