নিউ ইয়র্কের শীতের আমেজে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রে এক চারপেয়ে আগন্তুক। কোনো রাজকীয় তকমা ছাড়াই আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে খবরের শিরোনামে চলে এসেছে এক ধূর্ত লাল শেয়াল। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বন্দর থেকে সুদূর আমেরিকার নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত দীর্ঘ এই যাত্রায় তার কোনো টিকিট ছিল না, ছিল না কোনো পাসপোর্ট-ভিসা। স্রেফ নিজের উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরে এক কার্গো জাহাজে চড়ে সে হয়ে উঠেছে এক আধুনিক রূপকথার নায়ক।
গল্পের শুরুটা গত ৪ ফেব্রুয়ারিতে। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে যখন গাড়িবোঝাই বিশাল এক বাণিজ্যিক জাহাজ নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রওনা দেয়, তখন ক্রু সদস্যদের ঘুণাক্ষরেও কল্পনা ছিল না যে তাদের সাথে রয়েছে এক ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।
মাঝসমুদ্রে হঠাৎই নজরে আসে সেই ধূর্ত প্রাণীটি। জাহাজের কোণে লুকিয়ে থাকা প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের এই পুরুষ শেয়ালটি ততক্ষণে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। দুই বছর বয়সী এই লাল শেয়ালটি সম্ভবত কোনোভাবে জাহাজের মালামাল তোলার সময় লুকিয়ে পড়েছিল। টানা চৌদ্দ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যখন জাহাজটি নিউ ইয়র্ক এবং নিউ জার্সি বন্দরে নোঙর ফেলে, ততক্ষণে সে আটলান্টিক জয় করা এক সত্যিকারের অভিযাত্রী।
নিউ ইয়র্কে পৌঁছানোর পরদিনই এই ‘লোমশ বিদেশি’কে তুলে দেওয়া হয় বিখ্যাত ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের হাতে। চিড়িয়াখানার অ্যানিমেল প্রোগ্রামের পরিচালক কিথ লোভেট জানিয়েছেন, দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর এই ভ্রমণে প্রাণীটি বেশ মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে গেলেও বর্তমানে সে সুস্থ আছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার তেমন কোনো বড় সমস্যা ধরা পড়েনি। তবে বিদেশের মাটিতে খাপ খাইয়ে নিতে তাকে একটু সময় দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সে চিড়িয়াখানার অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ভুলপিজ ভুলপিজ’ বা লাল শেয়াল পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত প্রজাতি হলেও এই শেয়ালটির ডায়েট এখন বেশ রাজকীয়। ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানায় তার মেন্যুতে থাকছে নানা ধরনের ফলমূল, শাকসবজি, প্রোটিন এবং শেয়ালদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পুষ্টিকর বিস্কুট। বর্তমানে সে চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি সেন্টারে থাকলেও খুব শিগগিরই তার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানার ব্যবস্থা করা হবে।
সাউদাম্পটনের বন-বাদাড় ছেড়ে আমেরিকার ইট-পাথরের শহরে নতুন করে বসতি গড়া এই সাহসী শেয়ালটির গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে। প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে চলে আসা এই লোমশ পর্যটক যেন প্রমাণ করে দিল, ভ্রমণের নেশা শুধু মানুষের নয়-অরণ্যের সন্তানদেরও থাকতে পারে।


