পানি নামতেই চট্টগ্রামে ধ্বংসের চিত্র, ক্ষতি শত শত কোটি টাকা

পানি নামতেই চট্টগ্রামে ধ্বংসের চিত্র, ক্ষতি শত শত কোটি টাকা
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানিতে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ায় উঠে আসছে সড়ক অবকাঠামো ও ফসলি জমির ক্ষয়-ক্ষতির নানা চিত্র। বিভিন্ন স্থানে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছ ও গবাদি পশুর খামারে বড় ধরনের ধ্বংসের ছাপ রেখে গেছে বন্যা। অনেক স্থানে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় ভরসা অভ্যন্তরীণ সড়কের সিংহভাগই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে সেতু ও কালভার্ট।

সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম জোনের মোট ২১২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৩৪ দশমিক ০৯ কিমি, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৩২ দশমিক ৯৫ কিমি এবং জেলা মহাসড়ক ১৪৫ দশমিক ৯১ কিমি বন্যার কবলে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়কের পাশাপাশি পাঁচটি ব্রিজ এবং একটি কালভার্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার সবগুলোই বান্দরবান বিভাগে।

এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রাথমিক জরুরি বা স্বল্পমেয়াদি মেরামতের জন্য ৪৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হলেও, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই মেরামতের জন্য মোট ৩৩২ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিভাগীয় হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের অনুমান করা হয়েছে চট্টগ্রামে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী মেরামতের জন্য ১০৭ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ৮৫ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং বান্দরবান বিভাগে ৫৪ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি বিভাগে যথাক্রমে ২৯ কোটি ৫০ লাখ এবং ২৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার পুকুর ও শত শত মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে বিপুল পরিমাণ মাছ ও চিংড়ি ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় মাছ ও অবকাঠামো মিলিয়ে জেলাজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৯ কোটি ২৩ লাখ টাকায়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলায় ৩৯টি গরু, ৯৫টি ছাগল, ৪২টি ভেড়া, ১ লাখ ৪২ হাজার ১৩৭টি মুরগি, ১৩শ হাঁস মারা গেছে। এ ছাড়া ৪ হাজার ২১৮টি গবাদিপশুর খামার, ৫ হাজার ৬৭৪টি হাঁস মুরগির খামার, ১৬২ টন পশুর দানাদার খাদ্য, ১২ হাজার ৩৯৫ টন খড় ও ৬ হাজার ৯৬০ টন ঘাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবকিছুর আর্থিক মূল্য ৬০ কোটি ৬৮ লাখ এক হাজার একশত ৪০ টাকা।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে ১২ হাজার ১১০টি সরকারি ও ব্যক্তিগত নলকূপ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭ হাজার ৮৫১টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার ৬৯৪টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বন্যায় অন্তত ৫৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামোগত ক্ষতিক্ষতি ব্যাপক। চট্টগ্রাম জেলায় ৩৮৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারে ৬৫টি, বান্দরবানে ৫৬টি, রাঙ্গামাটিতে ৩২টি এবং খাগড়াছড়িতে ২৯টি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান জানান, জেলার ৪৯৫টি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১১টি এবং ৩৯৪টি মাদ্রাসা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা শনাক্ত হয়েছে ১০৭ জন ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১১২ জন এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ জন।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সভা করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। সেখানে তিনি বলেন, বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলায় সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি এখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, কৃষি পুনরুদ্ধার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী জানান, বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় কৃষি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করে উঁচু স্থানে বীজতলা তৈরির ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে আসন্ন মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত না হয়।

মন্ত্রী আরও বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ মোকাবিলার চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুত রেখেছে। স্থানীয় প্রশাসনকে স্বাস্থ্য সেবার প্রস্তুতির বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সভায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গবাদিপশুর মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে দুলু বলেন, বন্যায় মারা যাওয়া প্রতিটি গরুর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। ছাগল বা ভেড়া মারা গেলে প্রতিটির জন্য দেওয়া হবে ১০ হাজার টাকা। এ জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর