ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা লাল টকটকে পাকা স্ট্রবেরিটির দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল যান্ত্রিক হাত। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই কোনো রুক্ষতা। সিলিকনের তৈরি নরম একজোড়া থাবা দিয়ে সমুদ্রের অ্যানিমোনের মতো আলতো করে চেপে ধরল ফলটিকে। এরপর অত্যন্ত দক্ষ হাতের কারিগরের মতো সামান্য ওপরের দিকে একটি মোচড় দিতেই টুপ করে ছিঁড়ে এলো স্ট্রবেরিটি।
কোনো আঘাত নেই, নেই কোনো দাগ—মানুষের হাতের স্পর্শ ছাড়াই যান্ত্রিক হাতের এমন কোমল ছোঁয়ায় স্ট্রবেরি সংগ্রহের এই দৃশ্যটি চীনের নানজিংয়ের স্ট্রবেরি খামারের।
নানজিং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াং জিয়াওচানের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই বিশেষ রোবটটি তৈরি করেছেন, যা কৃষিপ্রযুক্তির দুনিয়ায় এক অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতে স্ট্রবেরির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নরম ফল সংগ্রহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। আগের রোবটগুলো সাধারণত কাঁচি ব্যবহার করে ফলের বোঁটা কাটত, যার ফলে ফলের গায়ে ধারালো ডাল থেকে যেত। এতে ঝুড়িতে থাকা একটি ফলের আঘাতে অন্যটি নষ্ট হয়ে যেত এবং পরে আবার হাতে করে সেগুলো পরিষ্কার করতে হতো।
অধ্যাপক ওয়াং জিয়াওচানের উদ্ভাবিত নতুন রোবটটি সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করেছে। আকারে একটি ছোট গাড়ির মতো এই মেশিনটি তার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং যান্ত্রিক হাতের সমন্বয়ে মাত্র ২০ সেকেন্ডের মধ্যে একটি পাকা স্ট্রবেরি শনাক্ত করে তা সফলভাবে সংগ্রহ করতে পারে। গবেষকদের দাবি, এই রোবটটি ৮৪ শতাংশ ক্ষেত্রে সফলভাবে ফল সংগ্রহ করছে এবং ফলের মান অক্ষুণ্ণ রাখছে।
প্রযুক্তির এই আধুনিকায়নে গবেষকরা সমুদ্রের অ্যানিমোনের গঠনশৈলীকে কাজে লাগিয়েছেন। বায়ুচালিত সিলিকন গ্রিপারটি ফলটিকে পিষ্ট না করে এমনভাবে আলতো করে ধরে যেন তা কোনো ক্ষতি ছাড়াই বোঁটা থেকে আলগা হয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের কোনো শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না, ফলে ফলগুলো সরাসরি প্যাকেটজাত করার উপযোগী থাকে।
রোবটটিতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক ‘ডিপ লার্নিং’ প্রযুক্তি। এর ফলে ঝোপের ভেতরে থাকা অসংখ্য ফলের ভিড়ে কোন ফলটি সবচেয়ে সহজে এবং বাধা ছাড়াই সংগ্রহ করা যাবে, রোবটটি তা নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই বুদ্ধিমত্তার কারণে রোবটটির কাজ করার দক্ষতা আগের তুলনায় ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অধ্যাপক ওয়াং জিয়াওচান ও তার দল এখন এই প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য করার জন্য একটি ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করছেন। এর মাধ্যমে সাধারণ কৃষকরা খুব সহজ কিছু নির্দেশের মাধ্যমেই রোবটটিকে মাঠের কাজে পরিচালনা করতে পারবেন।
বর্তমানে এটি মূলত স্ট্রবেরি সংগ্রহের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে টমেটো, চেরি বা অন্যান্য নরম ফলও সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। আধুনিক কৃষিকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করার পথে এই কোমল রোবট প্রযুক্তি এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে, যা বিশ্বজুড়ে কৃষকদের শ্রম ও সময় বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।


