ঋতু নামের বসন্ত এখন ফুটবল মাঠে ফুল ফোটায়

ঋতু নামের বসন্ত এখন ফুটবল মাঠে ফুল ফোটায়
একজন পাহাড়ি মেয়ে থেকে জাতীয় নায়িকা হয়ে উঠেছেন ঋতুপর্ণা। ছবি: ঋতুপর্ণা/ফেইসবুক
Advertisement
Advertisement

সব গল্পের শুরু কি ধামাকা দিয়ে হয়? নাহ, কিছু গল্প শুরু হয় নিঃশব্দে—চোখের কোণে লাজুক হাসি, মাঠের এক পাশে নিঃশব্দ অনুশীলন আর মনে একটা পুড়ে যাওয়া আগুন নিয়ে। ঠিক যেমন শুরু হয়েছিল ঋতুপর্ণা চাকমার।

আজ তাঁর বাঁ পা কথা বলে। গর্জন করে না, কিন্তু বুঝিয়ে দেয়—তাঁকে থামানো যায় না। মিয়ানমারের বিপক্ষে যে দুটি গোল করেছেন, তা শুধু গোল নয়—বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে এ যেন এক নতুন পৃষ্ঠা, যেটার কালিতে লেখা আছে সাহস, শিল্প আর সম্ভাবনার গল্প।

ম্যাচের প্রথম গোলটায় লেগেছিল মিয়ানমার ডিফেন্সের গায়ে, কিন্তু ফিরে পাওয়া বলটি আর কাউকে দেননি ঋতু। ঠাণ্ডা মাথায়, নিখুঁত এক প্লেসমেন্টে পাঠিয়ে দেন জালে। গোলকিপার ছুঁতেই পারেননি। আর দ্বিতীয় গোল? যেন কোনও চিত্রনাট্যকার আগেভাগেই লিখে রেখেছিলেন। বাঁ দিক থেকে বক্স বরাবর কাটা, শটটা এমনভাবে নিয়েছেন যে বলটা উড়ে গিয়ে গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে জালে ঢুকে যায়—এটা দেখে শুধু বাংলাদেশের ডাগআউট নয়, পুরো ফুটবলটাও যেন কিছুক্ষণ থমকে গিয়েছিল।

এই প্রথম বাংলাদেশ নারী দল এএফসি নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে উঠেছে। একটা দেশের ফুটবল উঠে এসেছে এক তরুণীর পায়ের স্পর্শে—এই লাইনটা যতটা শুনতে সহজ, অর্জনটা তার চেয়ে অনেক কঠিন।

২০২৪ সালের সাফের সেই মুহূর্তগুলিও ভোলার নয়। যেদিন ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে গোল করে দলকে এনে দেন টানা দ্বিতীয় শিরোপা, সেদিন অনেকেই বলেছিলেন—”সাবিনার পর আলোয় এখন ঋতুপর্ণা।” কিন্তু আলো তাঁকে চিনে নিয়েছিল আরও আগেই—হয়তো আমরা বুঝে উঠতে সময় নিয়েছি।

আরও পড়ুন

তবে সবচেয়ে বড় যে গল্পটা হয়তো আমরা বলি না, তা হলো তাঁর অভ্যন্তরের যুদ্ধ। বিদ্রোহের ভেতর থেকেও টিকে থাকা, কোচের আস্থাকে মর্যাদা দেওয়া, দল ভাঙলেও নিজের ছন্দ না হারানো—এসবই ঋতুপর্ণাকে আলাদা করে তোলে। পিটার বাটলার কেন তাঁর ওপর এত ভরসা রাখেন, সেটার উত্তর হয়তো ট্যাকটিকসে নেই, আছে হৃদয়ে। কোচ জানেন, যখন ম্যাচ ঝুঁকে পড়বে, তখন এমন কাউকেই লাগবে—যার ভিতরে থাকে বিস্ফোরণ, কিন্তু বাইরে থাকে স্থিরতা।

ভুটানে লিগ খেলতে গিয়েছিলেন ঋতু, সেখান থেকে ফিরে জর্ডান সফর, আর এবার মিয়ানমার মিশন—সবখানেই ঋতুপর্ণা ছিলেন ধ্রুবতারার মতো। যিনি শুধু গোল করেন না, গল্প লেখেন। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের প্রতিটি অধ্যায়ে এখন তাঁর ছায়া থাকবে।

বাংলাদেশ এখন যে এএফসি নারী এশিয়ান কাপে খেলতে যাচ্ছে, সেটি শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নয়—এটি একটি জাতির স্বপ্ন পূরণের দিগন্ত। আর সেই স্বপ্নের সূচনা হয়েছে এক পাহাড়ি কন্যার পায়ে।

আজ ঋতুপর্ণা আমাদের জন্য শুধুই একজন ফুটবলার নন—তিনি এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ, যিনি নিজের কাজ দিয়ে বলে দেন সবকিছু। সাফল্যের ভাষা হয়তো নিরব, তবে তাঁর পায়ে বাজে উচ্ছ্বাসের ঝংকার।

এই বাংলাদেশ নারী দল থেমে থাকবে না, সামনে যাবে। কিন্তু যেখানেই যাক, ইতিহাস বলে রাখবে—এই পথচলার অগ্রদূত ছিলেন একজন লাজুক, নীরব, তীব্র প্রতিভাধর তরুণী, যার নাম ঋতুপর্ণা চাকমা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad