নাভানা দেশে ব্যাংক খালি করে বিদেশে গড়েছে গোপন সাম্রাজ্য

নাভানা দেশে ব্যাংক খালি করে বিদেশে গড়েছে গোপন সাম্রাজ্য
Advertisement
Advertisement

দেশের ২৩টি ব্যাংকের প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ শোধ না করে নাভানা গ্রুপের মালিকপক্ষ সিঙ্গাপুর, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্তত পাঁচটি দেশে বিপুল অর্থ সরিয়েছেন।

তারা অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে ব্যাংক হিসাব খুলে অর্থ জমিয়েছেন, আন্তর্জাতিক হেজ ফান্ডে বিনিয়োগ করেছেন, বিদেশি বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিয়েছেন এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্য দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন, যা টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এক দশকের বেশি সময় ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরের বাইরে গড়ে ওঠে নাভানা গ্রুপের এই অফশোর আর্থিক সাম্রাজ্য। ২০২০ সালে অর্থ পাচার ও ঋণ খেলাপির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করলে বিষয়টি প্রথম সামনে আসে।

কিন্তু বিস্ময়করভাবে কয়েক মাসের মধ্যেই সেই অনুসন্ধান থামিয়ে দেওয়া হয়। একই বছর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গ্রুপটিকে নতুন ঋণসহ বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, যা নথিতে উঠে এসেছে।

১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত নাভানা গ্রুপ দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। অটোমোবাইল, নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট, জ্বালানি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক্স ও খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে তাদের ব্যবসা রয়েছে। একসময় টয়োটা ও হিনো ব্র্যান্ডের একমাত্র পরিবেশক হিসেবে পরিচিত গ্রুপটি অর্থ পাচারের কারণে বর্তমানে ঋণসংকটে জর্জরিত।

টাইমসের হাতে আসা বিপুল নথি, আন্তর্জাতিক করপোরেট রেকর্ড এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০০৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অন্তত ১৫ বছর ধরে বিদেশে একটি অফশোর আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন নাভানা গ্রুপের মালিকপক্ষ।

অনুসন্ধানে এই সময়ে অন্তত ৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে পুরো অর্থপ্রবাহের উৎস ও গন্তব্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব না হওয়ায় বিদেশে সরানো অর্থের প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়ে বহু গুণ বেশি হতে পারে।

একই সময়ে গ্রুপটির ব্যাংকঋণগুলোও অনিয়মিত হয়ে পড়তে শুরু করে। গ্রুপটির একাধিক বর্তমান ও সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার দাবি, ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বড় অংশই মালিকপক্ষ বিদেশে পাচার করেছেন।

নথিগুলো বিশ্লেষণ করলে বিদেশে সম্পদ সরানোর একটি ধারাবাহিক চিত্র ফুটে ওঠে। প্রথমে সিঙ্গাপুরে ব্যাংক হিসাব খুলে স্থায়ী আমানত রাখা ও আন্তর্জাতিক হেজ ফান্ডে বিনিয়োগ, দুবাই হয়ে হংকংয়ে অর্থ সরানো, এরপর কানাডায় অর্থ স্থানান্তর এবং সবশেষে বিনিয়োগের বিপরীতে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এই প্রতিটি নথিই নাভানার মালিকপক্ষের অবৈধ অফশোর আর্থিক নেটওয়ার্কের প্রমাণ বলে টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নাভানা গ্রুপের চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল ২০০৭ সালের আগে থেকেই তার বড় ছেলে ও গ্রুপটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমনের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকে (ইউওবি) একটি যৌথ প্রিভিলেজ ব্যাংকিং হিসাব পরিচালনা করতেন।

ওই হিসাবের ২০০৭ সালের একটি স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, ৪ লাখ ৫ হাজার ১৮৬ সিঙ্গাপুর ডলারের (৩ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা) স্থায়ী আমানত ও আর্থিক সম্পদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হেজ ফান্ড পারমাল এফএক্স ফাইন্যান্সিয়ালস এন্ড ফিউচারস লিমিটেডে তাদের বিনিয়োগ রয়েছে।

ব্যাংক স্টেটমেন্টে সিঙ্গাপুরের একটি বাণিজ্যিক ঠিকানা ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ওই হিসাব ও বিনিয়োগ বর্তমানে বহাল আছে কি না বা আরও বেড়েছে কি না, তা টাইমস স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে বিষয়টি তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন বিএফআইইউ’র কর্মকর্তারা।

আরও পড়ুন

২০১৪ সালের একটি নথি টাইমসের এই অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। এতে দেখা যায়, নাভানা সিএনজি লিমিটেডের প্রস্তাবিত একটি আন্তর্জাতিক বন্ড ইস্যুর আইনি খরচ হিসেবে ৯৩ হাজার ৪৮৯ মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।

হোগান লাভেলস লি অ্যান্ড লি’র ইনভয়েসে এই অর্থ হংকংয়ের হ্যাংসেং ব্যাংকে লৌ মান কিয়ুংয়ের হিসাবে পাঠানোর নির্দেশ ছিল।

দুবাইয়ের জিসিসি এক্সচেঞ্জের দুটি টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার ভাউচারে দেখা যায়, একই পরিমাণ অর্থ একই ব্যাংক হিসাব, একই রেফারেন্স নম্বর এবং একই সুবিধাভোগীর কাছে পাঠানো হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো বৈদেশিক লেনদেনের অনুমোদন ছিল না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, অনুমোদিত লেনদেন অবশ্যই বাংলাদেশে অবস্থিত কোন ব্যাংকের মাধ্যমে হতে হয়।

এই অর্থ বাংলাদেশ থেকে কীভাবে দুবাইয়ে পৌঁছেছিল, সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বিএফআইইউ এটি খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে।

এই সংবাদপত্রটির কাছে থাকা কয়েকশ পৃষ্ঠার নথির মধ্যে সিঙ্গাপুরের দ্য ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মেলনের বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ ঘোষণাপত্র, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান হোগান লভেলস লি এন্ড লি’র ইনভয়েস এবং এমার্জিং ক্যাপিটাল লিমিটেডের সঙ্গে বিদেশি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির পরামর্শক চুক্তির কপি রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) জানিয়েছে, এলপিজি বন্ড ইস্যু বা সংশ্লিষ্ট প্রাইভেট প্লেসমেন্ট সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেও এ বিষয়ে কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেনি নাভানা। একইভাবে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্টক এক্সচেঞ্জ ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অব অস্ট্রেলিয়ায় নাভানার কোনো প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ক্যারিবিয়ান পাসপোর্টের জন্য বিপুল ব্যয়

বিদেশে সম্পদ সরানোর এই ধারাবাহিকতায় সামনে আসে নাভানা গ্রুপের মালিকপক্ষের বিদেশি নাগরিকত্বের নথি। টাইমসের হাতে থাকা পাসপোর্ট অনুযায়ী, সাইফুল ইসলাম ২০২০ সালে এবং তার ছোট ভাই ও নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ২০২২ সালে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন।

কর স্বর্গ হিসেবে পরিচিত ক্যারিবীয় দেশ অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার নাগরিকত্ব পেতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। দুই ভাই যখন পাসপোর্ট নেন, তখন দেশটির বিনিয়োগভিত্তিক নাগরিকত্ব কর্মসূচির সবচেয়ে কম ব্যয়ের প্যাকেজে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা করে বিনিয়োগের শর্ত ছিল। সেই হিসাবে বিদেশি পাসপোর্ট পেতে দুই ভাই অন্তত ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এই বিনিয়োগ ফেরত-অযোগ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে, বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনের জন্য অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা কোনো অনুমোদন নেননি।

কানাডা সংযোগ

আরেক নথিতে দেখা গেছে, নাভানা গ্রুপের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন। পাচারের অর্থে সেখানে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অনুসন্ধান শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই অভিযোগগুলোর বিস্তারিত তথ্য আর উদ্ঘাটিত হয়নি।

ওই অনুসন্ধান সম্পর্কে অবগত দুদকের দুই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে টাইমস। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেই অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

পৃথক নথিতে দেখা যায়, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন সাইফুল ইসলাম সুমন।

তদন্ত থামিয়ে দিয়ে নাভানা গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ওই বছরেই। এক নথিতে দেখা গেছে, ২০২০ সালের আগস্টে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে গ্রুপটিকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার চলতি মূলধন সহায়তা এবং বিভিন্ন ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা ঋণ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অধিগ্রহণের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এর আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে তিন কিস্তিতে ৫০০ কোটি টাকা নতুন ঋণ পায় নাভানা।

বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, ওই ঋণের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিবেচনা ভূমিকা রেখেছিল। তার ভাষ্য, ‘শফিউল ইসলাম কামাল বঙ্গবন্ধুর কাছের লোক ছিলেন। তাকে সহায়তা করতে হবে’ – এই বক্তব্য দিয়েই বৈঠকের আলোচনা শুরু হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২৩টি ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা ফান্ডেড ঋণ নিয়েছে নাভানা গ্রুপ। এর বাইরে বেশকিছু ব্যাংকবহির্ভূক আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে নন-ফান্ডেড দায়সহ মোট ব্যাংকিং এক্সপোজার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকায় গ্রুপটি দেশের ১৩তম বৃহৎ ঋণগ্রহীতা।

আদালতের নথি অনুযায়ী, অধিকাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় শুধু ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যেই গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ৭৮টি ঋণ-পুনরুদ্ধার মামলা করেছে ১৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে গ্রুপটির বিরুদ্ধে শতাধিক অর্থসংক্রান্ত মামলা রয়েছে।

টাইমসের হাতে আসা নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এগুলোতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে নাভানা গ্রুপের পরিচালকদের সঙ্গে অর্থ পাচারের ইস্যু জড়িয়েছে। কারণ, তারা বিদেশে অর্থ স্থানান্তর বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোন অনুমোদন নেননি।’

বিএফআইই’র তদন্তে নাভানা গ্রুপের অর্থ পাচারের পুরো চিত্র উঠে আসবে বলে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্বাহী পরিচালক।

এই অনুসন্ধানের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত বুধবার ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপে নাভানা গ্রুপের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন, ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র এবং গ্রুপটির আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠায় টাইমস। শনিবার রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তারা কেউ জবাব দেননি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রশ্ন পাওয়ার পর তারা নম্বর ব্লক করে দেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad