সারা দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সরবরাহ সংকটের মধ্যে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। তবে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলমান সংকট কাটিয়ে বাজার স্বাভাবিক হতে এখনও অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
ধর্মঘটের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর সঙ্গে বৈঠকের পর সংগঠনটির সভাপতি সেলিম খান ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
বৈঠকে সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিনটি দাবি জানানো হয়, যার মধ্যে রয়েছে সারা দেশে এলপি গ্যাস বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বৈঠকে বলেন, চলমান অভিযানের বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং পরিবেশক ও খুচরা পর্যায়ের চার্জ বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) কমিশনকে আশ্বাস দিয়েছে যে জাহাজ সংকটের মধ্যেও আমদানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ফলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হতে পারে।
বিইআরসির সঙ্গে সভা শেষে সেলিম খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, অপারেটরদের কাছ থেকে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ও গ্যাস কিনতেই সরকার নির্ধারিত এক হাজার তিনশ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে, অথচ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এই অবস্থায় ১২ কেজির সিলিন্ডার এক হাজার পাঁচশ টাকার কম দামে বিক্রি করা কোনো বিক্রেতার পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে বৈঠকে বিইআরসি চেয়ারম্যান সভায় বলেন, সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য এক হাজার তিনশ ছয় টাকার বেশি দামে গ্যাস বিক্রির পক্ষে কোনো যুক্তি নেই।
এর আগে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংবাদ সম্মেলনে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সভাপতি সেলিম খান বলেন, ‘দেশে এলপিজির চরম সংকট চলছে এবং ২৭টি কোম্পানির সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডার বাজারে থাকলেও রিফিল হচ্ছে মাত্র এক কোটি ২৫ লাখ।’
তিনি বলেন, এর ফলে প্রায় চার কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে, যা পরিবেশকদের খরচ বাড়াচ্ছে এবং বাজারে দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেশির ভাগ কোম্পানি বন্ধ থাকায় পরিবেশকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও তিনি জানান। পর্যাপ্ত এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে পরিবেশকদের ভর্তুকি দিতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
সংগঠনটির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিইআরসি পরিবেশকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই দাম সমন্বয় করেছে এবং সংকট নিরসনের দিকে জোর না দিয়ে বাড়তি দাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযান বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, যার ফলে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এতে পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে ৭৫ টাকা করার দাবিও জানানো হয়।
এদিকে, কোম্পানি পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামেই গ্যাস বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি করেছে এলওএবি।
আমদানির ঘাটতিকেই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে এলওএবি জানায়, ডিসেম্বরে প্রত্যাশিত চালান না আসায় বাজারে স্বাভাবিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশীদ টাইমসকে বলেন, একাধিক ভিএলজিসি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে এবং অনেক আমদানিকারক ডিসেম্বরে প্রত্যাশিত চালান পাননি।
তিনি বলেন, মাসিক এক দশমিক তিন থেকে এক দশমিক পাঁচ লাখ টনের চাহিদার বিপরীতে ডিসেম্বরে দেশে আমদানি হয়েছে মাত্র ছিয়ানব্বই হাজার টন এলপিজি। জানুয়ারির প্রথমার্ধে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও ভালো খবর নেই বলেও তিনি জানান।
এলওএবি সভাপতি আমিরুল হক বলেন, সংকট শুরুর অনেক আগেই কিছু কোম্পানি এলপিজি আমদানি ও বোতলজাতকরণের সক্ষমতা বাড়ানোর অনুমোদন চেয়েছিল। সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় জ্বালানি বিভাগ সেসব আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলে তিনি জানান।
তবে বৃহস্পতিবার ওমেরা, মেঘনা, যমুনা, ইউনাইটেড আই গ্যাস ও ডেল্টা এলপিজির সেই আবেদনগুলো অনুমোদন করা হয়। একই দিনে জ্বালানি বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংককে এলপিজি আমদানিতে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেও চিঠি দিয়ে এলপিজি আমদানিতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার পাশাপাশি উৎপাদন ও অন্যান্য পর্যায়ে বিদ্যমান সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট ও আগাম কর অব্যাহতির প্রস্তাব প্রভাব বিশ্লেষণ সাপেক্ষে পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।
রোববার এসব সুবিধা নিশ্চিত হলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কিছু চালান দেশে পৌঁছাতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন আমিরুল হক।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে একটি চালান আসতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগে, আর থাইল্যান্ড থেকে সময় কিছুটা কম লাগলেও সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে জাহাজ পাওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে অন্তত দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতেই হবে, আর এর মধ্যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা সরকারকে প্রতিহত করতে হবে, যোগ করেন তিনি।
রান্নার জন্য এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ঢাকায় সরবরাহ সংকটে মুনাফাখোরীর প্রবণতা সবচেয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে। সারা দেশেই সরবরাহ সংকট থাকলেও ১২ কেজি সিলিন্ডারে প্রায় এক হাজার পাঁচশ টাকায় গ্যাস বিক্রির চিত্র দেখা যাচ্ছে, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় কম গ্যাস দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, ঢাকায় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযানের মুখে সরকার নির্ধারিত দামে কিছু গ্যাস বিক্রি হলেও সাধারণ মানুষ ওই দামে গ্যাস পাচ্ছেন না। জরুরি প্রয়োজনে অনেক ক্ষেত্রে এক হাজার পাঁচশ টাকার বেশি, এমনকি দুই হাজার দুইশ টাকা পর্যন্ত গুণতে হচ্ছে ক্রেতাদের।


