গাইবান্ধায় প্রায় সব নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও কমছে না নদীভাঙনের ভয়াবহতা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৬০টি পয়েন্টে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। পানি ওঠানামার সঙ্গে নতুন করে তীব্র হচ্ছে ভাঙন। চোখের সামনে শেষ সম্বল হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষ।
গত এক মাস ধরে গাইবান্ধার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি কখনো কমেছে, আবার কখনো বেড়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধির পর এখন পানি কমতে শুরু করলেও দেখা দিয়েছে ভাঙন। এরই মধ্যে জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সাদুল্লাপুর উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকায় অন্তত আট শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। প্রতিনিয়তই বিলীন হচ্ছে ভিটেমাটি ও ফসলের জমি।
জেলার সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, উজানবুড়াইল, ভাটি বুড়াইল, কেরানিরচর, মিন্টু মিয়ারচর, কাচিয়ারচর, বাদামের চর, হরিপুর ইউনিয়নের রাঘবচর, কালিচরিতাবাড়ী ও দক্ষিণ শ্রীপুর এলাকায় ভাঙন চলছে।
এ ছাড়া গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের অধিকাংশ চর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ফুলছড়ি উপজেলার দক্ষিণ রসুলপুর, ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমহন চর, খাটিয়ামারি, দক্ষিণ খাটিয়ামারি, কাউয়াবাদা এবং উড়িয়া ইউনিয়নের ভুসির ভিটা এলাকায়ও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাইবান্ধার নদ-নদীর বুকে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৬৫টি ছোট-বড় চর ও দ্বীপ চর। এসব চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে এসব এলাকার মানুষ ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
তবে চরাঞ্চলের মানুষ নদীর সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে আছেন। বন্যার পর নদীর পলি জমে যাওয়া জমিতে তারা আবার চাষাবাদ শুরু করেন। এসব চরে উৎপাদিত লাল মরিচ, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়া, তিল, বাদাম ও কাউন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানেও বিক্রি হয়। কিন্তু প্রতিবছর নদীভাঙন তাদের জীবনযাত্রাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত সুন্দরগঞ্জের তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৫৮ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৬৭ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।
অন্যদিকে গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি ৩৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৪৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলমান বন্যা মৌসুমে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধার কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর তীরবর্তী এলাকার বসতভিটা, গাছপালা ও আবাদি জমি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। চরাঞ্চলের শত শত বিঘা জমি মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের পাট, আউশ ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছে হাজার একর ফসলি জমি এবং বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার চরের বাসিন্দা ময়না বেওয়া বলেন, ‘দিন-রাত নদী ভাঙে, জমি ধসে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। বাড়ির জায়গায় ফাটল ধরেছে। অন্যের জায়গায় বাড়ি সরিয়ে এনেছি। ৬৫ বছর বয়সে কতবার যে বাড়ি সরাতে হয়েছে তার হিসাব নেই। এমন করে বেঁচে থাকা কষ্টকর।’
কৃষক হাশেম প্রধান বলেন, বন্যার পানি স্থায়ী হওয়ায় ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিনিয়তই চর ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
ফুলছড়ির রসুলপুরের বাসিন্দা জনি মিয়া বলেন, ‘নদীতে পানি কমতে শুরু করেছে, কিছুটা ভাঙনও কমেছে। কিন্তু কখন আবার পানি বাড়বে বলা যায় না। নদীর পাড়ের মানুষের কোনো শান্তি নেই। সারা বছরই নদীর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়।’
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লারচরের বাসিন্দা সাহাদত মন্ডল বলেন, ‘নদীতে পানি বাড়লেও ভাঙে, আবার পানি কমলেও ভাঙে। পুরো ইউনিয়নটাই চর হওয়ায় প্রতিবছর ভাঙনের কারণে এটি বিলীনের পথে।’
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, চলমান বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে জেলায় প্রায় ৯০০ বিঘা জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চরাঞ্চলে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানির দীর্ঘমেয়াদি ওঠানামার কারণে যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। নতুন করে যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে, সেসব স্থানেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


