ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মঈন উদ্দিন ফিলিং স্টেশনে গত ১৬ মার্চ থেকে তেলের নজলগুলো শুকিয়ে আছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সেখানে অপেক্ষমাণ কোনো যানবাহন এক ফোঁটা অকটেনও পায়নি। এই পরিস্থিতির কারণে সাধারণ যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
অথচ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসের ভেতরে চিত্র ছিল একদম উল্টো। সেখান থেকে বারবার বার্তা দেওয়া হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
সরকারি আশ্বাস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে এই বিশাল ব্যবধান দেশের জ্বালানি খাতের সুশাসনকে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হওয়ার পর একটি উদ্বেগজনক বিষয় সামনে এসেছে। জ্বালানি সংকটটি আসলে মজুত স্বল্পতার কারণে নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব অথবা পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটির কারণে সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশের জ্বালানি খাতের এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক এবং অস্বস্তিকর তথ্য। তা হলো, বর্তমানে দেশে ঠিক কী পরিমাণ জ্বালানি মজুত আছে, তা সরকার সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। বিপিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির মোট ধারণক্ষমতা ৫৩ হাজার ৩৬১ টন। চলতি বছরের শুরুতে বিক্রির হার ছিল স্বাভাবিক। জানুয়ারিতে ৩২ হাজার ৮৩৫ টন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭ হাজার ৩৩৪ টন এবং মার্চে ৩৭ হাজার ৪৩৯ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান স্বীকার করেন, আমদানির পর তা বিতরণ করার চক্রটি চলমান থাকায় বর্তমানে মজুতের সঠিক হিসাব দেওয়া কঠিন। তবে তিনি দাবি করেন, জরুরি অবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সীমার ওপরেই জ্বালানি মজুত রয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রধান সরকারি সংস্থার মজুত সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে না পারা বড় ধরনের জবাবদিহিতার অভাব নির্দেশ করে। এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর পেতে গিয়ে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে। বিপিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারজিন হাসান মৌমিতা জানান, এই তথ্য মন্ত্রণালয় সংরক্ষণ করে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ সাদেক টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, জ্বালানি মজুতের সবশেষ তথ্য বিপিসি সংরক্ষণ করে। মন্ত্রণালয় তাদের তথ্যের ওপরই নির্ভর করে।
বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে উচ্চ পর্যায়ে তথ্যের এক ধরনের শূন্যতা লক্ষ করা গেছে।
স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যের এই অস্পষ্টতা কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজির হোসেন বলেন, স্বচ্ছতার এই অভাব আসলে প্রতারণার একটি হাতিয়ার। যদি সরবরাহ সত্যিই স্বাভাবিক থাকত, তবে মূল্যবৃদ্ধির পরপরই কেন তেলের দীর্ঘ লাইন অদৃশ্য হয়ে গেল। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনগণকে জিম্মি করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, সংকটের মুহূর্তে জ্বালানি মজুত সম্পর্কে সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য জনসমক্ষে থাকা জরুরি। অন্যথায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। হয় বিপিসি অথবা মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে এই পরিস্থিতির পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, দাম বাড়ার পর যদি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়, তবে কৃত্রিমভাবে জ্বালানি আটকে রাখার বিষয়টি জোরালো হবে। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন, সরকার এসব অনিয়ম বন্ধে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বর্তমান অভিযানগুলো সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত ১৯ এপ্রিল সরকার তেলের দাম বাড়ানোর পর রাতারাতি সংকটের সমাধান হতে দেখা যায়। যেসব লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, তা মিনিটে নেমে আসে। দুষ্প্রাপ্য জ্বালানি হঠাৎ করে সহজলভ্য হয়ে যায়। সাধারণ মোটরচালকদের কাছে এটি কাকতালীয় মনে হয়নি, বরং কৃত্রিম সংকটের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
আক্তার হোসেন নামের একজন মোটরসাইকেল চালক জানান, তিনি এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানির জন্য ঘুরেছেন। দাম বাড়ার পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি তেলের মজুত আগে থেকেই থাকত, তবে কেন তা আগে দেওয়া হয়নি।
বিপিসির কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও রয়েছে বৈপরীত্য। মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন দাবি করেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করায় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তবে তিনি স্বীকার করেন, আগে আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে স্বল্পতা ছিল। তার এই মন্তব্য আগে দেওয়া সরকারের ‘পর্যাপ্ত সরবরাহ’ বার্তার সরাসরি বিপরীত।
সরবরাহ চেইনে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য এখন ক্রমশ সামনে আসছে। বিপিসি কর্মকর্তাদের মতে, মাঠ পর্যায়ের কিছু খুচরা বিক্রেতা অবৈধভাবে তেল মজুত করেছিলেন। তারা কম দামে কেনা তেল বেশি মুনাফার আশায় ধরে রেখেছিলেন এবং দাম বাড়ার পর তা বাজারে ছেড়েছেন।
সারা দেশে চালানো এক অভিযানে এই অবৈধ মজুতের প্রমাণ মিলেছে। ৬৪টি জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ লিটার অবৈধ তেল উদ্ধার করা হয়েছে। নয় হাজারেরও বেশি অভিযানে তিন হাজার ৫১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এত কিছুর পরেও সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সরকারি দাবিটি মাঠ পর্যায়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। মিরসরাইয়ের একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. নূর নবী জানান, তার স্টেশনে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে কোনো অকটেন আসেনি। সরবরাহ বৃদ্ধির দাবি করা হলেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে এক ফোঁটা তেলও পাননি। ডিজেলের সরবরাহও অনিয়মিত এবং চাহিদার মাত্র অর্ধেক।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি আবু তৈয়ব জানান, জেলা শহরে ভিড় কমলেও উপজেলাগুলোতে এখনও তীব্র সংকট রয়েছে। বিপিসি পেট্রোলে ২০ শতাংশ অকটেন মিশ্রণের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল নেই।
এই জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে পদ্মা অয়েল কোম্পানির একটি বড় কেলেঙ্কারিতে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে পরিবহনের সময় ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল নিখোঁজ হওয়ার পর চার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জাল নথির মাধ্যমে সেই তেল সরবরাহ হয়ে গেছে বলে দেখানো হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, সেই তেল কালোবাজারে সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং ভেজাল অকটেন হিসেবে বিক্রি করা হয়ে থাকতে পারে।
বিগত দুই মাসের ঘটনাপ্রবাহ জ্বালানি খাতের পদ্ধতিগত দুর্বলতাগুলোকে উন্মোচিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা, তাৎক্ষণিক তথ্যের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং দুর্নীতির সুযোগ। স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় মজুতদারি ও কালোবাজারি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির পর পেট্রোল পাম্পে লাইন ছোট হয়ে যাওয়া জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আস্থা ফেরানোর বদলে এটি প্রমাণ করেছে সংকটটি অন্তত আংশিকভাবে এড়ানো সম্ভব ছিল।
যখন তেলের দাম বাড়ে, তার চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বেড়ে যায়। জ্বালানি সরবরাহ হয়তো শুরু হয়েছে, কিন্তু জবাবদিহিতার অভাবে আস্থার যে বড় সংকট তৈরি হয়েছে, তা রয়েই গেছে।


