নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলা/ চাঁদাবাজি নয়, জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলছে পুলিশ

চাঁদাবাজি নয়, জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলছে পুলিশ
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর ইসিবি চত্বর-সংলগ্ন নিউ গিনি প্রপার্টিজে শনিবার রাতে গুলি ছোড়া, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা চালানো হয়। পুলিশ বলছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজের জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে এ হামলা হয়ে থাকতে পারে। সেখানে চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে কাদের মধ্যে সেই বিরোধ তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। হামলায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় নিউ গিনি কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের জেরেই হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। তবে বিরোধটি কোন পক্ষের মধ্যে এবং হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ কী, তা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মাহিদুল ইসলাম জানান, হামলার খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে আরও তিনজনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং হামলায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ার, ভাষানটেক থানা যুবলীগের সহ-সভাপতি শাহ আলম অনিক, ভাষানটেক বস্তির মামুন, টাঙ্গাইলের আসলাম ও মুন্না।

চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মাহিদুল বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য বর্তমানে পুলিশের কাছে নেই। প্রাথমিকভাবে জমিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের বিষয়টিই সামনে এসেছে।

ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম। ছবি: টাইমস

অন্যদিকে, হামলার পেছনে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

রোববার দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেকোনো বিরোধের জেরে এ ধরনের হামলা চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

রাজধানীর একাধিক স্থানে হামলা ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনার জড়িতদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, রাজধানীর একাধিক স্থানে হামলা ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে।

হামলার বিষয়ে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, চাঁদা দাবি ও জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে এবং এর পেছনে পুরো একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে।

চাঁদা দাবির বিষয় জানিয়ে নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘চক্রটি বিভিন্ন কৌশলে একেক সময় একেক পরিমাণের টাকা দাবি করেছে। গত এক মাসে আমার কাছে চক্রটি কখনো ১ কোটি, কখনো ৫০ লাখ, আবার কখনো ২ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা চায়। আমি তাদের চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানাই। চাঁদাবাজির সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা জড়িত রয়েছে।’

জমি দখলের সঙ্গে কে জড়িত জানতে চাইলে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক বলেন, ‘সাবেক সরকারি এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন। ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে এই এলাকায় ১০ কাটা জমি আমি কিনেছি। তিনি তা আমাকে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন। মূল সমস্যা এই জায়গা নিয়ে না। মূল সমস্যা হচ্ছে ওই ১০ কাটার পাশে আরও জায়গা আছে। ওই জায়গাটির জন্য আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমাকে দিয়েই ডেভেলপ করিয়ে নিয়েছে। টাকাও নিয়েছে এখন রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন না।’

আরও পড়ুন

পাঁচটি পিকআপে এসে হামলার অভিযোগ

নিউ গিনি প্রপার্টিজের কর্মকর্তা মো. পল্লব আলীর দাবি, হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে এসেছিলেন। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। গুলি করতে করতে তারা হাউজিংয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন।

তিনি বলেন, প্রবেশমুখের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে ঢুকে হামলাকারীরা লুটপাট চালান। সেখান থেকে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে যায়। এরপর তারা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালান। নিউ গিনি প্রপার্টিজের অফিসেও হামলা করা হয়।

পল্লব আলী বলেন, হামলাকারীরা নির্মাণশ্রমিকদেরও মারধর করে তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিউ গিনি প্রপার্টিজে একদল দুর্বৃত্ত ব্যাপক হামলা ও লুটপাট চালায় রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ দুজনকে হাতেনাতে আটক করে।

তছনছ সালমানের স্টুডিও

হামলার সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, স্টুডিওটির বিভিন্ন অংশ তছনছ হয়ে আছে। মেঝেতে পড়ে রয়েছে কাচের টুকরা, ভাঙা সোফা, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম।

চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাব ও যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্টুডিওর কর্মীদেরও আতঙ্কিত অবস্থায় দেখা যায়।

সালমান মুক্তাদির রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া ভিডিওতে বলেন, হামলায় তার পুরো স্টুডিও ধ্বংস হয়ে গেছে। স্টুডিওতে ক্লায়েন্টদের বিভিন্ন ফুটেজ ও শুটিংয়ের উপকরণ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব নষ্ট ও হারিয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কাজের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।

তবে নিজের ভিডিও বার্তায় সালমান মুক্তাদির হামলার পেছনে চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে বলেও ধারণা দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জমির মালিকের সঙ্গে চাঁদা চাওয়া বা এ ধরনের কোনো বিরোধের জের ধরে হামলা হয়ে থাকতে পারে এবং সেই ঘটনায় মাঝখানে তার স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত চাঁদাবাজিকে হামলার কারণ হিসেবে নিশ্চিত করেনি।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি গিয়াস উদ্দিন জানিয়েছেন, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি। নিউ গিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের সঙ্গে পাশের জমির মালিকের বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। সেখানে চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা ঘটেনি।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে সালমান মুক্তাদিরের কাছে চাঁদা চাওয়ার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এমনকি কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্রও নেই। ঘটনার পুরোটাই নিউ গিনি প্রপার্টিজের মালিক পক্ষের ব্যক্তিগত ঝামেলা। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও এই প্রপার্টিজের মাঝে পরায় সেখানেও ভাঙচুর হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুই বছর আগেও একই এলাকায় হামলা-লুটপাট

নিউ গিনি প্রপার্টিজ ঘিরে বর্তমান ঘটনার আগে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাতেও ইসিবি চত্বর এলাকায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলাকায় ‘ডাকাতি’ হচ্ছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়।

সেই ঘটনায় নাজমা আক্তার নামে এক নারী অভিযোগ করেছিলেন, তারা যে জমিতে বসবাস করছিলেন, সেটি ‘অনলাইন গ্রুপ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। ওই জমির পাশেই ছিল নিউ গিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের আবাসন প্রকল্প।

নাজমা আক্তারের অভিযোগ ছিল, নিউ গিনি প্রপার্টিজ ওই জমি দখলে নিতে মিরপুর থেকে শত শত লোক নিয়ে এসেছিল। তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলেও তিনি দাবি করেছিলেন। তবে তার এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো যাচাই সে সময় পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি টিনশেড বাড়িতে হামলার ঘটনাটি মূলত জমি দখলকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল। পরে ঘটনাটিকে ‘ডাকাতি’ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলে মিরপুর-১১সহ আশপাশের এলাকার লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, ইসিবি চত্বরের ওই এলাকায় জমি দখল ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি ওই বিরোধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় লোকজন জড়ো করেন এবং হামলা-চাঁদাবাজির মতো ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়দের কেউ কেউ স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্ন পক্ষের লোকজনকে ব্যবহার করে জমি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad