সিনিয়রকে পরিচয় না দেওয়াকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) কথাকাটাকাটি, মারধর, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও হলকেন্দ্রিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষে আইসিটি বিভাগ ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করার সময় ঘটনার সূত্রপাত। আইসিটি বিভাগের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সালমান পাটোয়ারী আবীর ও তার সহপাঠী ওমর লাইব্রেরিতে কথা বলার একপর্যায়ে পাশে থাকা নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব তাদের আস্তে কথা বলতে বলেন এবং জানতে চান, ‘তোরা কোন ব্যাচের?’
আবীর ‘সরি’ বলে সেখান থেকে চলে যান। পরে আবীরের বন্ধু সামীন মজুমদার বের হলে শাকিল তাকে লাথি দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা প্রক্টর অফিসে গিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। তবে সমাধানের সময় প্রক্টর অফিসে বসে আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ছবি তুলে রাখেন সাকিলের বন্ধু ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের রাফসান সামি এবং অন্যান্যরা মারধরের হুমকি দেন।
প্রক্টর অফিস থেকে বের হওয়ার পর পরিস্থিতি পুনরায় উত্তপ্ত হয়। ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আইসিটির দুই শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে চাইলে মূল ফটকের সামনে লাঠি-সোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায় প্রত্নতত্ত্ব ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শাকিল, একই বর্ষের ইংরেজি বিভাগের কাজী তাহসিন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের মাজহারুল ইসলাম আবীর, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের এহসান, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের রাফসান সামি, নৃবিজ্ঞান বিভাগের তানবীর সাকিব ও আইন বিভাগের শাকিল আহমেদ প্রান্ত। এ সময় আইসিটি বিভাগের ওই শিক্ষার্থীও মারামারিতে জড়ান।
পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীদের দৌড়ে আইসিটি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হন। প্রক্টরিয়াল বডি গেট খুলে দিলে আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা হামলাকারীদের ধাওয়া করে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের সামনে উপস্থিত হয়। তখন দত্ত হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও পূর্বে হামলাকারী আবীর আইসিটি বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে সংঘর্ষ দ্বিমুখী রূপ নেয়।
এ সময় ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের নৃবিজ্ঞান বিভাগের জুনাঈদ লামিম, একই বর্ষের মাজহারুল ইসলাম আবীর, ইংরেজি বিভাগের কাজী তাহসিন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শাকিল খান, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সৌরভ কাব্য, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের শিহাব, শফিউল্লাহ আকাশ এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের মোহাম্মদ তাওহীদ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তিয়াস, নৃবিজ্ঞান বিভাগের নাজমুল হোসেন ও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের মর্তুজা হোসাইন সিদ্দিকসহ দত্ত হল ও বিজয়-২৪ হলের আরও কিছু শিক্ষার্থী আইসিটি বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থীকে মারধর করেন।
ঘটনায় আক্রান্ত আইসিটি বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী সামিন মজুমদার বলেন, ‘প্রক্টর অফিসের কাছে মীমাংসার পর আমরা বের হচ্ছিলাম। এ সময় কয়েকজন ডেকে নিয়ে গলা চেপে ধরে ও ঘুষি মারে। আত্মরক্ষায় আমিও তাদের মারি।’
অপর শিক্ষার্থী ইফতেকার বলেন, ‘ক্লাস শেষে যাওয়ার পথে ১০ থেকে ১২ জন আমাদের ওপর হামলা করে। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও তারা পেছনে এসে মারধর করে এবং বাঁচাতে আসা শিক্ষার্থীদেরও মারে।’
এ ছাড়া ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের সাকিব ও প্রত্নতত্ত্বের শাকিলের সঙ্গে আইসিটি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীর আগের বিরোধও এই উত্তেজনায় যুক্ত হয়।
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে আইসিটি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের তাওহীদ, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শামীম মজুমদার, ইফতেখার, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, নিশারুল, সাইফ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের শিক্ষার্থী নিবিড় রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের ডেপুটি চিফ মাহমুদুল হাসান সোহাগ জানান, তাদের এখানে ১২ জন ভর্তি হন। এর মধ্যে ৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, যাদের একজনের হাত ভেঙে গেছে।
এদিকে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রভোস্ট জনি আলম বলেন, ‘ঘটনাকে কেন্দ্র করে দত্ত হলে আক্রমণ করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
আইসিটি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. তোফায়েল আহমেদ ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে জানান, এ ঘটনায় একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘প্রথমে মীমাংসা করা হলেও পরে আবার কী নিয়ে ঝামেলা হয়েছে বলতে পারছি না। আলোচনা করে জড়িতদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। হলে আক্রমণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। ভিডিও ফুটেজ কমিটির প্রতিবেদন পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


