গৌরবময় তাঁতশিল্প ও টাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎ

গৌরবময় তাঁতশিল্প ও টাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎ
Advertisement
Advertisement

সংকটের মধ্যেই আলোর সন্ধান

নদী চর খাল বিল গজারির বন

টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।

এই গরবের ধন টাঙ্গাইল শাড়ি তথা তাঁত শিল্প এখন গভীর সংকটে। টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প, ইউনেস্কো কর্তৃক ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ’ (অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমানে টিকে থাকার লড়াই করছে। জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই শাড়ি একদা যেমন ঐতিহ্যের প্রতীক, তেমনি এখন এটি অর্থনৈতিক সঙ্কট, উৎপাদন ব্যাহত ও বাজারচ্যুতির শিকার। টাঙ্গাইলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার তাঁতের মধ্যে ৪০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যটি শিল্পের বর্তমান করুণ অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

টাঙ্গাইলে তাঁতশিল্পের সমস্যা

১. জ্বালানি ও উৎপাদন সংকট: বিদ্যুৎ সংকট শিল্পের অন্যতম প্রধান শত্রু। টাঙ্গাইলে বিদ্যুতের চাহিদা (১৭০ মেগাওয়াট) ও যোগানের (১০০-১১০ মেগাওয়াট) মধ্যে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিং-এ উৎপাদন কমে যাচ্ছে, যা কর্মীদের আয় এবং দুর্গাপূজার মতো মৌসুমি চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। একজন তাঁতশ্রমিক জানান, ‘এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসে, তারপর ৩-৪ ঘণ্টা থাকে না’ — এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের সংসার চালানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২. অর্থনৈতিক সঙ্কট ও ঋণের বোঝা: উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু শাড়ির ন্যায্য দাম মিলছে না। একাধিক তাঁত মালিক ব্যাংক ও এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালু করলেও লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। ৪৬টি তাঁতের মালিক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন এবং পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।

৩. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থবিরতা: ভারত-বাংলাদেশ স্থলবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতি পিস শাড়ি রপ্তানিতে আগে খরচ ছিল ৩৮ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকায়। ফলে টাঙ্গাইল শাড়ির প্রধান বাজার ভারতে প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

৪. কাঁচামালের সংকট: তাঁত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল বা সুতা আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। বর্তমানে একদিকে ব্যাংকিং সংকট আরেকদিকে ভারতের সাথে শুল্ক, অশুল্ক বানিজ্যিক বাধায় সুতা আমদানি ব্যহত হচ্ছে। তাছাড়া উভয় দেশের রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে ভিসা সংকট তো আছেই। এমতাবস্থায় বাড়তি দামে ভিন্ন উপায়ে অথবা স্থানীয় নিম্নমানের সুতা ব্যবহার করতে হচ্ছে।

৫. মানবসম্পদ সঙ্কট: একটি শাড়ি তৈরি করতে ২-৩ দিন সময় লাগে, আর মজুরি মাত্র ৭০০-৭৫০ টাকা। এই আয়ে চার সদস্যের পরিবার চালানো অসম্ভব। দক্ষ তাঁতিরা পেশা ছেড়ে রিকশাচালক, অটোচালক বা নির্মাণশ্রমিকের কাজ নিচ্ছেন। বাজিতপুরের প্রদীপ তরফদারের ভাষায়, ‘একটি শাড়ি তৈরি করতে প্রায় তিন দিন লাগে, অথচ মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ৭৫০ টাকা।’ এই বাস্তবতায় নতুন প্রজন্ম তাঁতশিল্পে আসতে চাইছে না।

আরও পড়ুন

সম্ভাবনা: সংকটের ভেতরেই আশার আলো

১. স্বীকৃতি ও ব্র্যান্ডিং: ইউনেস্কো ও জিআই স্বীকৃতি টাঙ্গাইল শাড়ির বিশ্ববাজারে অবস্থান শক্তিশালী করবে। শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির ভাষায় টাঙ্গাইলের শাড়ি দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারীরা জাতিসংঘ বা বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সফরে পরিধান করেন। এই পরিচিতি শিল্পের জন্য বড় সম্পদ।

২. নতুন চাহিদা সৃষ্টি: জিআই নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বিতর্কের ফলে টাঙ্গাইল শাড়ির চাহিদা ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে শিল্পটি।

৩. সরকারি উদ্যোগ: বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে তাঁতশিল্পকে সমৃদ্ধ করা হবে। তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বেসিক সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বর্তমান সরকার এই শিল্প প্রসারে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বৈদেশিক বাজারে যাতে আরো সুবিধা করতে পারে সেজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেয়া হচ্ছে বলে জানান তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ জাকির হোসেন।

৪. পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ: শুধু শাড়ি নয়, কুশন কভার, পর্দা, থ্রি-পিস স্যুট ও পাঞ্জাবি ফ্যাব্রিক তৈরির মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

করণীয় সুপারিশ

১. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ: উৎপাদন ধরে রাখতে তাঁত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। বিশেষ করে দুর্গাপূজা ও ঈদের মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বরাদ্দ দিতে হবে।

২. স্বল্পসুদে ঋণ ও প্রণোদনা: প্রান্তিক তাঁতিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ ও প্রণোদনা সহায়তা কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

৩. স্থলবাণিজ্য পুনরুদ্ধার: ভারতের সঙ্গে স্থলবাণিজ্য সহজীকরণে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিকল্প রপ্তানি পথ খুঁজতে হবে।

৪. মজুরি ও বাজার ব্যবস্থাপনা: শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত এবং সরাসরি বাজারের সঙ্গে তাঁতিদের সংযোগ স্থাপনে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

৫.  আইন ও প্রশিক্ষণ: ইউনেস্কো কর্তৃক সুপারিশকৃত ‘লিভিং হিউম্যান ট্রেজার’ সিস্টেম চালু এবং স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে বুননশিল্পের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

 

দেশের প্রাচীন ও নিজস্ব এ শিল্পকে বাঁচাতে আমাদের সফল হতেই হবে। তাঁত পণ্য নিয়ে কাজ করা শ্যামা লাইফস্টাইল-এর স্বত্বাধিকারী শ্যামলী বেগম মনে করেন তাঁত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রথম এবং প্রধান বিষয়টি হবে স্বল্পমূল্যে সুতা, রাসায়নিক দ্রব্য ও অন্যান্য কাঁচামাল প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দেশীয় পণ্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে হবে।

শিল্প গবেষক শাওন আকন্দের আশাবাদী বক্তব্য, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি বিবর্তিত হবে। এটি টিকে থাকবে।’ তবে এই টিকে থাকা নির্ভর করবে সরকার, ব্যবসায়ী ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার লক্ষ্যমাত্রা ২৪ লাখ শাড়ি বিক্রি ও ৩৫০ কোটি টাকা আয়। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব, যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মার এক অনন্য প্রকাশ। এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর