গরের পর কোহলার: ঢাকা-ওয়াশিংটন সামরিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা

গরের পর কোহলার: ঢাকা-ওয়াশিংটন সামরিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা
অ্যাডমিরাল স্টিফেন কোহলার। ইলাস্ট্রেশন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক আরও মজবুত করছে বাংলাদেশ। ‌‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকেই ধারাবাহিকভাবে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে ঢাকা।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তিন দিনের সফরে মঙ্গলবার বাংলাদেশে আসছেন মার্কিন নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের (প্যাসিফিক ফ্লিট) প্রধান অ্যাডমিরাল স্টিফেন কোহলার।

সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। এরপরই এই মার্কিন কর্মকর্তার  সফর প্রমাণ করে, বাংলাদেশ তার সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে এখন কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, অ্যাডমিরাল কোহলার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল আলম, নৌবাহিনী প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। তিনি রাজধানীর লালবাগ কেল্লা ও সেনানিবাসে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) ঘুরে দেখবেন।

এ ছাড়া বীর উত্তম এ কে খন্দকার বিমানবাহিনী ঘাঁটি পরিদর্শন ও সেখানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর মহড়া পর্যবেক্ষণ করবেন অ্যাডমিরাল কোহলার।

সেনাবাহিনী সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের কোনো প্রধানের এটাই প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। এ থেকে এটাই স্পষ্ট হয়, ঢাকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে ওয়াশিংটন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এর আগে ২০২২ সালে মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের তৎকালীন প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল জে পাপারো কক্সবাজারে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ‘আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউ’তে যোগ দিতে এসেছিলেন। তবে সেই সফরে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে কোনো বৈঠক হয়নি।

কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর প্রমাণ করে দুদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন আরও গভীর হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভর না করে কৌশলগত অংশীদারত্বের পরিধি বাড়ানোর যে চেষ্টা বাংলাদেশ করছে, তা-ও ফুটে উঠেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সাবেক সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খোরশেদ আলম এই পরিবর্তনকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির একটি বড় বিবর্তন হিসেবে দেখছেন।

টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এটি প্রতিরক্ষা নীতিতে এক স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া এখন এক বাস্তব সত্য।’

অ্যাডমিরাল কোহলারের সফর নিয়ে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ বা সফর নতুন কিছু নয়। তবে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা বেশ অর্থবহ।

আরও পড়ুন

একই কথা মনে করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) কাজী মোহাম্মদ কায়সার হোসেন। তিনি বলেন, ’সম্ভবত এই প্রথম প্যাসিফিক ফ্লিটের কমান্ডার বাংলাদেশ সফর করছেন, যার নিজস্ব একটি বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে।’

টাইমসকে তিনি আরও জানান, এই সফর উপলক্ষে আসা ২২ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের দলটিতে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, এবারের বৈঠকগুলোতে সাধারণ সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি আরও বিস্তৃত বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

সুযোগের নতুন দুয়ার

বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত জোরালো সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বড় কৌশলগত সুফল আনবে। এতে দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়বে, বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার দক্ষতা তৈরি হবে এবং বাইরে থেকে আসা ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে যেসব দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বড় দুটি যুদ্ধজাহাজও যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আনা হয়েছে।

খোরশেদ আলম বলেন, বাংলাদেশের সামরিক চাহিদা অনুযায়ী ভবিষ্যতে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন এবং মাঝারি থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো সামরিক প্রযুক্তিও পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ওয়াশিংটন আমাদের নৌপ্রতিরক্ষা আরও জোরদার করতে আধুনিক মানের অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করতে পারে।’

কাজী কায়সার হোসেনের মতে, মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গরের সফর এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশের যোগদানের পর মার্কিন নৌপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি সমুদ্র রাজনীতিতে আরও গভীর অর্থ তৈরি করে।

তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একক প্রভাব রয়েছে।  চীনের সঙ্গে বাংলাদেশেরও সকল পরিস্থিতিতেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থের কারণে মার্কিন-বাংলাদেশ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা খুব সহজে বা সরলরেখায় না-ও এগোতে পারে।

তা ছাড়া, নিরাপত্তা ও সমুদ্র সহযোগিতার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতই মূল অগ্রাধিকার পায়। সে কারণেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক মূলত কিছু যৌথ মহড়া ও প্রশিক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জানান, গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বাড়াবে। এটি এমন বার্তা দেবে, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদার রয়েছে।

তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হলে অন্যান্য সমমনা দেশগুলোর সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহায়তার দুয়ার খুলে যাবে।

এ ছাড়া, দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত সামরিক তথ্য সুরক্ষা চুক্তি (জিএসওএমআইএ) স্বাক্ষরিত হলে তা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে। কারণ এতে আমেরিকার বিভিন্ন সামরিক সহায়তা সহজে পাওয়া যাবে।

মার্কিন সরকারি হিসাবমতে, ২০১৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ‘ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং’ (এফএমএফ) হিসেবে ৭৮ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার এবং সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য (আইএমইটি) ১৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার অর্থসহায়তা দিয়েছে।

কে এই অ্যাডমিরাল কোহলার?

অ্যাডমিরাল স্টিফেন টি ‘ওয়েব’ কোহলার ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডার থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করে নেভাল রিজার্ভ অফিসার্স ট্রেনিং কোরের মাধ্যমে নৌবাহিনীতে যোগ দেন।

দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি প্যাসিফিক ফ্লিটের ডেপুটি কমান্ডার, থার্ড ফ্লিটের কমান্ডার এবং জয়েন্ট স্টাফের স্ট্র্যাটেজি, প্ল্যান্স অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তার এই সফর ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো-প্যাসিফিক) এলাকার সমুদ্র রাজনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। তবে তাদের মতে, সব বড় পরাশক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক ও মূল ভারসাম্য বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে নেওয়াই হবে ঢাকার বড় চ্যালেঞ্জ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad