রাজধানীর শিশু হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে দশ মাস বয়সী শিশু মোহাম্মদ। কয়েক দিন ধরে তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি নেই।
মা পিংকি জানান, ছেলের শরীরে প্রথমে যখন লালচে দাগ দেখা দেয় তখন তারা ভেবেছিলেন সাধারণ অ্যালার্জি। তারা বুঝতেই পারেননি শিশুটি হামে আক্রান্ত। প্রথমে তাকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে রক্তে সংক্রমণ থেকে হওয়া জ্বর ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা চলে।
টানা ছয় দিন সেখানে থাকলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য নিরুপায় হয়ে পরিবারটি তাকে নিয়ে ঢাকায় আসে। এখানে আসার পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন মোহাম্মদের হাম হয়েছে। তার জন্য এখন জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ প্রয়োজন।
কিন্তু পিংকি জানান, তাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, আইসিইউর খরচ কীভাবে জোগাব?’
পিংকি একা নন, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপে এমন সংকটে পড়েছে আরও অনেক পরিবার। বিশেষ করে গরিব পরিবারগুলো চিকিৎসার খরচ আর থাকা-খাওয়ার চিন্তায় দিশেহারা।
হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন এমন রোগীর ভিড় বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এখন রোগীর তিল ধারণের জায়গা নেই। হামের জটিলতায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মার্চ মাসেই সেখানে ১৩০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। বুধবার আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে আরও ১৪ জন। এরই মধ্যে তিনজন শিশু মারা গেছে, বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছে ৫৬ জন শিশু।
হাসপাতালের অন্য একটি ওয়ার্ডে চার বছর বয়সী আলিফকে নিয়ে চিন্তিত তার মা ফাল্গুনী। তিনি মানুষের বাসায় কাজ করেন। আলিফের বাবাও অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। চিকিৎসকরা আলিফকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেও ফাল্গুনী দোটানায় আছেন।
তিনি জানান, ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করলে অসুস্থ স্বামীকে দেখার কেউ থাকবে না। হাম দ্রুত ছড়ায় বলে তিনি এখন দুই সন্তানকে নিয়ে আলাদা থাকছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা বা আইসোলেশন খুবই জরুরি।
অধ্যাপক বেনজির আহমেদ জানান, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু খুব সহজে ১৮ থেকে ২০ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তিনি প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন।
বেনজির আহমেদ আরও বলেন, পুরোপুরি আলাদা ঘর না পাওয়া গেলেও কাপড় বা কোনো আড়াল দিয়ে রোগীকে অন্যদের থেকে দূরে রাখা উচিত। তা না হলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়াবে এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তার মতে, হাম যেভাবে ছড়াচ্ছে তা এখন মহামারির পর্যায়ে চলে গেছে। এই সংকট সামলাতে বড় ধরনের জরুরি পরিকল্পনা দরকার।
আরেক মা আসমা তার ছেলে রাফসানকে নিয়ে হাসপাতাল ইউনিটে আছেন। বাড়ি ফেরার পর হঠাৎ করেই রাফসানের জ্বর ও কাশি শুরু হয়। গত মঙ্গলবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রাফসান এখন স্থিতিশীল থাকলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।
সারা দেশের তথ্য বলছে, মার্চ মাসে হাম ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ৫৬ জন শিশু মারা গেছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, রাজশাহী ও তার আশেপাশে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ল্যাবে ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে এই ১৫ জনের মৃত্যুর পেছনে হামের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে শিশু হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার রিয়াজুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে। অনেক শিশু অত্যন্ত গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছে যাদের দ্রুত আইসিইউ দরকার। কিন্তু হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা সংখ্যা খুব কম। আসন খালি না থাকলে পরিবারগুলোকে অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সব পরিবারের সেই সামর্থ্য থাকে না। ফলে ঝুঁকি নিয়েই সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।
সরকারের টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হামের টিকার হার কমে ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। অথচ ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই হার ৯০ শতাংশের ওপরে ছিল।
সংক্রমণের এই ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে সরকার এখন জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান শুরু করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বুধবার জানান, আগামী রোববার থেকে টিকাদানের এই বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হবে। প্রথমে বেশি আক্রান্ত উপজেলাগুলোতে এবং পরে সারা দেশে এই কার্যক্রম চলবে। এর আওতায় ছয় মাস থেকে দশ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।


