যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ফের ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৩২ ফিলিস্তিনি  

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ফের ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৩২ ফিলিস্তিনি  
গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হতে না হতেই তা লঙ্ঘন করে ফের গাজায় বড় পরিসরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শনিবার উপত্যকা জুড়ে হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩২ ফিলিস্তিনি।  হামাস পরিচালিত সিভিল ডিফেন্স সংস্থার দাবি, নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী ও শিশু রয়েছে।

সিভিল ডিফেন্স ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বরাতে বিবিসি জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত একটি তাঁবু লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে হামলা চালায় ইসরায়েল। ওই হামলায় তাঁবুতে অবস্থানরত একই পরিবারের সাত সদস্য নিহত হয়েছেন।

সংস্থাটির এক মুখপাত্র জানান, বিভিন্ন হামলায় আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট, তাঁবু, আশ্রয়কেন্দ্র এবং গাজার একটি অস্থায়ী পুলিশ স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গাজা সিটির আল শিফা হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, শহরটিতে একটি আবাসিক ভবনে বিমান হামলায় একই পরিবারের তিন শিশু ও দুই নারী নিহত হয়েছেন।

নিহত তিন শিশুর চাচা সামের আল-আতবাশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমার তিন ছোট ভাতিজিকে রাস্তায় পড়ে থাকতে পেয়েছি। তাদের মরদেহ… তারা (ইসরায়েল) বলে যুদ্ধবিরতি আছে- কিন্তু ওই শিশুদের দোষ কী? আমাদের দোষ কী?’

নিহত স্বজনের মরদেহ ঘিরে এক ফিলিস্তিনির আহাজারি। ছবি: এপি/ইউএনবি

প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিও ও ছবিতে গাজার বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার এবং বহু ভবন ধ্বংস হয়ে যেতে দেখা গেছে।

জানুয়ারির শুরুতে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ কার্যকরের পর এটিই ছিল গাজার শরণার্থী শিবির লক্ষ্য করে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, গত শুক্রবার হামাস সদস্যরা প্রথমে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করায় তার জবাব দিতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

এক বিবৃতিতে আইডিএফ জানায়, ড্রোনের সাহায্যে ধারণকৃত ভিডিওতে পূর্ব রাফাহ এলাকায় ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো থেকে আটজন ফিলিস্তিনিকে বেড়ীয়ে আসতে দেখা যায়। তাদের সবাইকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে শনাক্ত করার পর ওই এলাকায় অভিযান চালায় ইসরায়েলি সেনারা।

গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ কার্যকরের পর থেকে শর্ত অনুযায়ী গোটা অঞ্চলটি ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

আইডিএফ দাবি করে, ইসরায়েল সিকিউরিটি এজেন্সি (আইএসএ)-এর সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। হামাসের চারজন কমান্ডার ও অন্য সদস্য, একটি অস্ত্র সংরক্ষণাগার, একটি অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং মধ্য গাজা উপত্যকায় হামাসের দুটি রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ছিল এসব হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু।

অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি শর্ত লঙ্ঘন করে এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে হামাস। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি দাবি করে, এই ধারাবাহিক হামলা প্রমাণ করে- ইসরায়েলি সরকার গাজা উপত্যকায় তাদের ‘নির্মম ও গণহত্যামূলক যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজায় নতুন করে বিমান হামলা চালানোয় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে মিসর। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সব পক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের’ আহ্বান জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী কাতারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

এদিকে প্রায় আট মাস বন্ধ থাকার পর রোববার থেকে গাজার সঙ্গে মিসরের রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং ফের খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গাজায় পুরোদমে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে পারবে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলি বাহিনী দেশটির সবশেষ জিম্মির মরদেহ উদ্ধার করার পর যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তানুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ঠিক তার আগ মুহূর্তেই গাজা জুড়ে ইসরায়েলি বিমান হামলার এই ঘটনা ঘটল।

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেন। প্রথম ধাপের আওতায় জিম্মি ও বন্দি বিনিময়, ইসরায়েলের আংশিক সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

উইটকফ জানান, দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি প্রযুক্তিনির্ভর ফিলিস্তিনি সরকার প্রতিষ্ঠা, অঞ্চলটির পুনর্গঠন এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করা হবে, যার মধ্যে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর অস্ত্র ত্যাগের বিষয়টিও রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলায় দক্ষিণ ইসরায়েলে প্রায় ১২শ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর পরই ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে।

হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৬৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের হিসাবে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে চারজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad