বহুমাত্রিক আলমগীর কবির: মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, চলচ্চিত্র নির্মাতা

বহুমাত্রিক আলমগীর কবির: মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, চলচ্চিত্র নির্মাতা
আলমগীর কবির
Advertisement
Advertisement

ত্রিশ বছরের যুবক আলমগীর কবির ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায় যান। প্রত্যাশা ছিল রণাঙ্গনে সরাসরি যুদ্ধ করার। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে নিয়োগ দেয়। সেখানে তিনি ‘আহমেদ চৌধুরী’ ছদ্মনামে ইংরেজি সংবাদ পাঠ করতেন। খাঁটি ব্রিটিশ উচ্চারণে তার কণ্ঠে উচ্চারিত ‘ দিস ইজ রেডিও বাংলাদেশ, মুজিবনগর…’ বাক্যটি মুক্তিযুদ্ধের খবর বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার এক প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্র’ তালিকায় আলমগীর কবিরের তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে। ১৯৩৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটিতে জন্ম হলেও তার পৈতৃক নিবাস বরিশালের বানারীপাড়ায়। পিতার চাকরিসূত্রে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় হুগলীর কলোজিয়েট স্কুলে। দেশভাগের পর তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্নাতক শেষ করে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়ন শুরু করেন। সেখানে পড়াশোনার সময় সুইডিশ পরিচালক ইংমার বার্গম্যানের দ্য সেভেন্থ সিল চলচ্চিত্রটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার প্রেরণা জোগায়। পরবর্তীতে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে চলচ্চিত্রের ইতিহাস, পরিচালনা ও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করেন।

পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিরোধিতা করে তিনি বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে ‘ডেইলি ওয়ার্কার’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। ষাটের দশকে কিউবায় গিয়ে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন এবং ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ ও ‘ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট’ গড়ে তোলেন। ফিলিস্তিন ও আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে ফরাসি সরকারের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং আট মাস কারাভোগ করেন।

১৯৬৬ সালে দেশে ফিরে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে আইয়ুব সরকারের হাতে গ্রেপ্তার হন। ব্রিটিশ নাগরিকত্বের সুবাদে মুক্তি পেলেও তাকে এক বছর নজরবন্দি থাকতে হয়।

কারামুক্তির পর তিনি ‘পাকিস্তান অবজারভার’, ‘হলিডে’ এবং নিজ প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় কাজ করেন। ষাটের দশকে চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ পুরস্কার লাভ করেন।

আরও পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংবাদ পাঠের পাশাপাশি জহির রায়হানের প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড-এ সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। একই সময়ে তিনি লিবারেশন ফাইটার্স, পোগ্রোম ইন বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন।

তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩) মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ফুটেজ ও কাহিনিচিত্রের অনন্য সংমিশ্রণ। এ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে বাচসাস এবং জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সূর্য কন্যা (১৯৭৫) নারীর অবস্থান নিয়ে সাহসী ব্যাখ্যার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭) ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাসের বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়ে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য ও সংলাপের জন্য জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। রূপালী সৈকত (১৯৭৯) শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে বাচসাস পুরস্কার পায়। মোহনা (১৯৮২) শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের জাতীয় পুরস্কার এবং মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ডিপ্লোমা অব মেরিট অর্জন করে। পরিণীতা (১৯৮৪) শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পায়। মহানায়ক (১৯৮৫) ছিল তার শেষ নির্মিত চলচ্চিত্র।

বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। তিনি সাতটি পূর্ণদৈর্ঘ্য এবং নয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন।

সংগঠক হিসেবেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৭ সালে তিনি পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা সিনে ক্লাব ও ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন, যা দেশে প্রাতিষ্ঠানিক চলচ্চিত্র শিক্ষার সূচনা করে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের সমন্বয়ক হিসেবে তিনি মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল ও তারেক মাসুদের মতো নির্মাতাদের গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ১৯৬৮ সালে মঞ্জুরা বেগমকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে বিচ্ছেদের পর ১৯৭৫ সালে অভিনেত্রী জয়শ্রী কবিরকে বিয়ে করেন। জয়শ্রী কবির তার একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি বগুড়ায় একটি চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠান শেষে ঢাকায় ফেরার পথে নগরবাড়ী ফেরিঘাটে সড়ক দুর্ঘটনায় আলমগীর কবিরের মৃত্যু হয়। মাত্র ৫০ বছর বয়সে তার প্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad