দুই সপ্তাহ আগে দেশে ফেরার পর থেকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক এবং ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা প্রতিদিন তার সঙ্গে দেখা করছেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও এর মিত্র দলগুলোর সম্ভাব্য ও মনোনীত প্রার্থীরাও নিয়মিত তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করছেন।
এসব সাক্ষাতে আলোচনার মূল বিষয় ছিল আসন্ন নির্বাচন, নির্বাচন পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার এবং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উপায়। শনিবার বনানীর একটি হোটেলে সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গেও তার শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারের আনুষ্ঠানিক শুরুর আগে তারেক রহমান ১১ থেকে ১৪ জানুয়ারি উত্তরবঙ্গ সফর করবেন। এই সফরে থাকছে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম।
১৭ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর ঢাকার বাইরে এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম সফর। এ ছাড়া ১৮ জানুয়ারি সকালে তিনি কক্সবাজার যাবেন এবং সেদিনই সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে একটি দোয়া মাহফিলে যোগ দেবেন। এরপর ২২ জানুয়ারি সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহ পরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন তারেক রহমান।
নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে তারেক রহমানের ঢাকার বাইরে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত বিরোধী মহলে ভিন্ন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সফর নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের এই সফরের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের কোনো সম্পর্ক নেই।
এই সফরে যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের কবর জিয়ারত করবেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এই সফর সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আচরণবিধি কোনোভাবেই লঙ্ঘিত হবে না। বিএনপি প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে আশ্বস্ত করেছে, আচরণবিধি ভঙ্গ হতে পারে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড রোধে তারা সজাগ থাকবে।
এ ছাড়া সফরের পথে কোনো মিছিল, জনসভা বা শোডাউন না করা এবং কোনো ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ বা পোস্টার না লাগানোর জন্য নেতাকর্মীদের বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে তারেক রহমানের সফরের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সার্বিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই সফরের উদ্দেশ্য হলো শহীদদের কবর জিয়ারত করা। এখানে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, কেউ কেউ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখলেও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো একটি জাতীয় দায়িত্ব। দলীয় নেতার এই সফরের ইচ্ছা দীর্ঘদিনের ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে দেরি হয়েছে। এই সফরে নির্বাচনী প্রচারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সফরের সময় তারেক রহমান বিভিন্ন জেলার দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। দলের একজন নেতা জানান, এই আলোচনার সময় তিনি নির্বাচনী মাঠে দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন।
এই সফরে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং আবু সাঈদসহ জুলাই আন্দোলনে শহীদদের কবর জিয়ারত করবেন তারেক রহমান। এ ছাড়া তিনি জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, তারেক রহমান ১১ জানুয়ারি সকাল ৯টায় তিনি গুলশানের বাসভবন থেকে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হবেন। দুপুর ১টায় টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারত করবেন এবং পরে যমুনার পশ্চিম তীরে সিরাজগঞ্জে যাত্রাবিরতি করবেন। সেখান থেকে তিনি বগুড়া যাবেন এবং আলতাফুন্নেসা স্কুল মাঠে খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়ে সেখানে রাতযাপন করবেন।
তিনি ১২ জানুয়ারি বগুড়া থেকে রংপুরের পীরগঞ্জে গিয়ে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন এবং এরপর দিনাজপুরে যাবেন। সেখানে তিনি তার নানী তৈয়বা মজুমদারের কবর জিয়ারত করবেন ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করবেন। পরে তিনি জুলাই আন্দোলনের শহীদদের কবর জিয়ারত করবেন। এরপর ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে রাতযাপন করবেন তারেক রহমান।
পরদিন ১৩ জানুয়ারি তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে পঞ্চগড়, নীলফামারী ও লালমনিরহাট সফর করবেন এবং প্রতিটি জেলায় শহীদদের কবর জিয়ারত শেষে গভীর রাতে রংপুরে ফিরবেন। এর পরদিন ১৪ জানুয়ারি তিনি রংপুর থেকে তার নির্বাচনী এলাকা বগুড়া-৬ (গাবতলী) আসনের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। পরদিন ভোরে তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।


