দুই পাশে জলরাশি, শাপলাসহ নানা রকম জলজ উদ্ভিদ। মাঝে-মধ্যে অতিথি পাখি ঝাঁক ধরে নামে পানিতে। মাঝখানে গ্রামীণ পাকা সড়ক। এই সড়কের বাওর ব্রীজ নামের স্থানটিতে একটি চায়ের দোকান ঘিরে বসেছে মিলনমেলা! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল চায়ের কুঠিরে এক কাপ চা খেতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত নারী-পুরুষ। স্থানীয় কলেজ পড়ুয়া চার তরুণের ছোট্ট উদ্যোগ রীতিমত আলোড়ন তুলেছে এলাকায়। প্রত্যন্ত এলাকার নিজের গ্রামকে তুলে ধরেছেন দূর-দূরান্তের মানুষের কাছে।
জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণ ক্রোকচর বাওর ব্রীজে প্রতিদিন বিকালে আশেপাশের যুবক-তরুণেরা আড্ডা দিতেন। বিকাল হলেই স্থানীয় সালাহউদ্দিন, দীন ইসলাম, রাহাত, শাকিল বাওর ব্রীজের ওপর বসে সময় কাটাতেন। দুই পাশেই বিশাল প্রাকৃতিক জলাশয়। বর্ষায় পানিতে টইটুম্বর থাকে আর শীতে শুকিয়ে যায়। বর্ষা এবং শীত দুই ঋতুতেই গ্রামীণ আবহে ঢাকা থাকে এই এলাকা। ইউটিউবে নির্জন গ্রামে চায়ের দোকান দেখে নিজেরাই দোকান তৈরির উদ্যোগ নেন। ‘চায়ের কুঠির’ নামে নিজেরাই তৈরি করতে শুরু করেন দোকানঘর। পাশাপাশি ছোট্ট দুটি দোকান তৈরি করেন। দোকান তৈরির ছবি, ভিডিও প্রচার করতে থাকেন সামাজিক মাধ্যমে। সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখে উদ্বোধন করেন এই চায়ের দোকান। রং চা, দুধ চা, মালাই চা আর পোড়া পাউরুটি। উদ্বোধনের দিন থেকেই চায়ের দোকান ঘিরে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। এখন প্রতিদিন বিকাল হলেই মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় প্রত্যন্ত পল্লীর বাওর ব্রীজ এলাকা।

সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মূল গ্রাম থেকে বেশ পল্লীতে দক্ষিণ ক্রোকচর এলাকার বাওর ব্রীজ। মূলত গ্রামীন একটি পাকা সড়ক দুই গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। সড়কের দুই পাশেই বিস্তৃর্ণ ফসলের ক্ষেত। যা বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায়। শীতকালে শুকিয়ে গেলে রবিশস্যসহ নানা ফসল চাষ করা হয় এখানে। বর্ষায় চারপাশে পানি থাকায় প্রকৃতি বেশ মনোরম হয়ে উঠে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় তরুণদের চায়ের দোকান এলাকায় সাড়া ফেলেছে। দূর দূরান্ত থেকে নানা বয়সীরা চা খেতে এসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। বিকাল হতেই লোক সমাগম বাড়তে থাকে এখানে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুদের নিয়ে তরুণ-তরুণীরা এসে ভিড় করেন এখানে। চায়ের দোকানে সৃষ্টি হয় লম্বা লাইন। চায়ের পাশাপাশি এখানে চটপটি-ফুচকার দোকানও রয়েছে। রয়েছে দোলনাও।
জানতে চাইলে উদ্যোক্তা দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখানে আড্ডা দিতাম। আমরা সবাই পড়াশোনা করি। বিকাল হলেই বাড়ির পাশের ব্রিজে আড্ডা দেই। এক সময় মনে হয় এখানে একটা চায়ের দোকান দেওয়া যেতে পারে। ইউটিউবে এরকম স্থানে চায়ের দোকানের একটি ভিডিও দেখি। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করে কাজে নেমে পড়ি। নিজেরাই দোকান তৈরি করি। ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করি। দোকানের বয়স মাত্র ১ মাস। প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রচুর বিক্রি হয়। মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার চা বিক্রি করছি।’
উদ্যোক্তাদের আরেকজন মো.সালাহউদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‘আমরা চিন্তা করতে পারিনি আমাদের এত বিক্রি হবে। প্রতিদিন ১০/১৫ হাজার টাকার চা-রুটি বিক্রি করি। ৩০/৩৫ কেজি দুধের চা বিক্রি হয়। এখানে এখন পাঁচটি দোকান রয়েছে। আমরা দুটি দোকান দিয়ে শুরু করি।’

শরিয়তপুর থেকে আসা মো. সবুজ বলেন, ‘আমি একজন সৌদি প্রবাসী। টিকটকের মাধ্যমে এই চায়ের দোকানের খোঁজ পাই। বাড়িতে আসার পর এখানে আসলাম। আসলে চায়ের স্বাদ খুবই ভালো। সবচেয়ে ভালো লাগে প্রাকৃতিক পরিবেশ। সব মিলিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে এই প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানো এবং চা পান বেশ ভালো লাগছে।’
সোনিয়া আক্তার নামে এক তরুনী বলেন, ‘চায়ের দোকানটি এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। চা খেতে এসে অনেকেই ভিডিও করছে, ছবি তুলছে। এদের মালাই চা আর পোড়া রুটির স্বাদ ঠোঁটে লেগে থাকে।’
আরেক তরুনী ইশরাত জাহান বলেন, ‘আধা ঘন্টা ধরে চায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। প্রচুর ভিড়। লম্বা সিরিয়াল থাকে দোকানে।’

শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘চায়ের দোকান ঘিরে এখন মানুষের মেলা। প্রতিদিন বিকাল হলেই দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ আসেন চা খেতে। ভ্রমণপ্রেমীরা নতুন একটি দর্শনীয় স্থান খুঁজে পেয়েছে। ওদের চা বেশ ভালো হয়। চা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে যে কাউকে।’
উদ্যোক্তা দীন ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা সবাই এখনও লেখাপড়ি করছি। বিকালে অবসর সময়ে আমরা চায়ের দোকান করি। বেকার থাকার চেয়ে ভালো আইডিয়া নিয়ে শুরু করলে সফল হওয়া সম্ভব। আশেপাশের পানি শুকিয়ে গেলে এখানকার জমিতে সূর্যমুখী চাষ করবো। জমি লীজ নিয়েছি। আমাদের গ্রামের নাম এখন মানুষের মুখে মুখে। সারা বছরই যাতে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন সেই পরিকল্পনা রয়েছে।’
ইচ্ছাশক্তি, সঠিক পরিকল্পনা আর কাজ করার মানসিকতা থাকলে যেকোনো কাজেই সফলতা মেলে। অযথা ঘুরে ফিরে সময় নষ্ট না করে স্বল্প পুঁজি নিয়েই ভালো আয় করা সম্ভব। শিবচরের প্রত্যন্ত গ্রামের চার তরুণের উদ্যোগ অনুপ্রাণিত করছে অন্যদেরও। অন্যরাও দেখছেন উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন।


