ঢাকার নদীতীরের বিভিন্ন অংশে সরকারি সম্পত্তি আর ব্যক্তিগত ব্যবহারের মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। জনসাধারণের জন্য সংরক্ষিত নদীতীরের জমি কোথাও বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাট, বসতবাড়ি কিংবা নানা ধরনের স্থাপনা। সরকারি জমির এমন ব্যবহারে শুধু দখলের বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে না, জনসম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নদীর জায়গা চিহ্নিত ও সুরক্ষিত রাখতে সীমানা পিলার স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও নদীতীরের বিভিন্ন অংশ এখনও বেড়া দিয়ে ঘিরে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও সরকারি জমি ঘিরে তৈরি করা হয়েছে ব্যক্তিগত পরিসর, কোথাও সেই জায়গা থেকে চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম।

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের সি ব্লকের ১ নম্বর সড়কের পাশে এমনই একটি জায়গা ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট একটি শিশু পার্ক। অভিযোগ রয়েছে, এক বাড়ির মালিক সরকারি মালিকানাধীন নদীতীরের একটি অংশ দখল করে সেখানে বেড়া দিয়েছেন এবং জায়গাটিকে শিশুদের বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। প্রত্যেক শিশুর জন্য ৪০ টাকা প্রবেশ ফি নিয়ে সেই পার্কে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।
শিশুদের খেলার জন্য একটি জায়গা তৈরি হয়েছে বলে, বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও এর আড়ালে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন: জনসাধারণের মালিকানাধীন জমি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার বা বাণিজ্যিক কাজে লাগানোর অধিকার কার?
প্রশ্নটি শুধু একটি পার্ককে ঘিরে নয়। ঢাকার বিভিন্ন নদীতীর এলাকায় সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে দোকান, বাজার, বসতবাড়ি ও অন্যান্য অননুমোদিত স্থাপনা। কিন্তু কোথাও স্থায়ী বা কোথাও অস্থায়ী এসব দখল ধীরে ধীরে নদীতীরের জনসম্পত্তিকে সংকুচিত করছে।

সরকারি জমি অনুমোদন ছাড়া দখল করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার চলতে থাকলে এর আরেকটি নেতিবাচক প্রভাবও তৈরি হবে। এতে এমন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে, সরকারি সম্পত্তি দখল করলেও তার জন্য বড় কোনো শাস্তি ভোগ করতে হয় না। আর সেই ধারণাই অন্যদের একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে।
৩৫ বছর বয়সী চায়ের দোকানি রুবেল মনে করেন, সরকারি জমি দখলকারীরা এভাবে অন্যায্য সুবিধা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা দোকান ভাড়া নিয়ে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করি। অথচ যারা অবৈধভাবে সরকারি জমি দখল করে, তাদের কোনো ভাড়া দিতে হয় না। সাধারণ ছোট ব্যবসায়ীদের যেসব খরচ বহন করতে হয়, তাদের সেসবও করতে হয় না। এভাবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকলে অন্যরাও মনে করতে পারে, সরকারি জমি দখল করে অর্থ উপার্জন করা সহজ।’

তিনি আরও বলেন, ‘নদীতীর সবার। একজন যদি সরকারি জমিতে বেড়া দিয়ে সেখানে ব্যবসা করতে পারেন, তাহলে অন্যরাও নিজেদের জন্য নদীতীরের একটি অংশ দখল করতে উৎসাহিত হতে পারেন।’
আইনে রয়েছে শাস্তির বিধান
সরকারি জমি দখল বা অবৈধভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আইনি ঝুঁকিও রয়েছে।
বাংলাদেশের ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি অবৈধভাবে দখল করা, অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করা কিংবা সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আইনের ১১ ধারায় এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনে অবৈধ দখল ও স্থাপনা অপসারণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
একইভাবে, ১২ ধারায় সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা জনসাধারণের ব্যবহারের জমি অবৈধভাবে ভরাট করা কিংবা এর প্রকৃতি পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের মতো শাস্তির বিধান রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী মতিউর রহমান বলেন, ‘এটি শুধু একটি ছোট পার্কের বিষয় নয়। যখন সরকারি জমি দখল করে সেটিকে ব্যক্তিগত ব্যবসায় পরিণত করা হয়, তখন এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে, কোনো পরিণতি ছাড়াই সরকারি সম্পত্তি দখল করা যায়। এসব অস্থায়ী স্থাপনা স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আগেই কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
প্রশ্ন শুধু ৪০ টাকার নয়
তাই বিষয়টি কেবল ৪০ টাকা প্রবেশ ফি নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মূল প্রশ্ন হলো– যে কোনো ব্যক্তি ধীরে ধীরে নদীতীরের সরকারি জমিতে বেড়া দিয়ে, স্থাপনা নির্মাণ করে এবং তা থেকে ব্যক্তিগত আয় করার পথ তৈরি করলে সেই জমি আদৌ কতটা জনসাধারণের সম্পত্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

বিআইডব্লিউটিএর সীমানা পিলার হয়তো চিহ্নিত করে দেয়, কোথা থেকে সরকারি নদীতীরের জমির শুরু। কিন্তু শুধু পিলার বসালেই সেই সীমানা সুরক্ষিত হয় না। জনসম্পত্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত দখলমুক্তকরণ এবং আইনের ধারাবাহিক ও কার্যকর প্রয়োগ।
নদীতীর শুধু কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়—এটি নগরের পরিবেশ, জনপরিসর ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ। তাই নদীর সীমানা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেই সীমানা রক্ষা করাও এখন জরুরি।


