বহুত্ববাদী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় এক সেমিনারের বক্তারা।
তারা বলেছেন, বহুত্ববাদের কথা বললেই তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। রাষ্ট্রের সব জাতিসত্তা, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের পরিচয়, মর্যাদা এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নেও আদিবাসী, নারী, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ জরুরি।
শনিবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষা ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাংবিধানিক বহুত্ববাদ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। আইপিনিউজ বিডির উপদেষ্টা সম্পাদক সতেজ চাকমার সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ।
আলোচনায় অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, কবি ও প্রাবন্ধিক সাখাওয়াত টিপু এবং বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা।
সারা হোসেন বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি জাতীয় সংসদে নারীর অধিকারের পাশাপাশি সব মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন। জুলাই সনদে বহুত্ববাদের কথা বলা হলেও বৈষম্য কীভাবে দূর করা হবে এবং এ জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা সুস্পষ্ট নয়।
তার মতে, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘুর মধ্যকার বৈষম্য নিরসনে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমেও আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সারা হোসেন বলেন, সত্যিকার বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার চিন্তাকে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার থাকা, কথা বলা এবং দাবি তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনোভাবেই হতাশ হওয়া যাবে না।
মূল প্রবন্ধে পাভেল পার্থ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গ্রাফিতি জনআকাঙ্ক্ষার দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শ্রমজীবী, আদিবাসী, শিশু ও নিম্নবর্গের মানুষের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস মূলধারার বয়ানে ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে পড়ছে। গ্রাফিতি মুছে ফেলা বা ছিঁড়ে ফেলার মধ্য দিয়েও অভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষা আড়াল করা হয়েছে।
জুলাইকে শুধু সরকার বা শাসন পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে না দেখে দীর্ঘদিনের বৈষম্য, ঔপনিবেশিক কাঠামো ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কাপ্তাই বাঁধকে ঘিরে মানুষের অভিজ্ঞতা এবং মধুপুর ও ফুলবাড়ীর গণপ্রতিরোধের সঙ্গে জুলাইয়ের যোগসূত্র তুলে ধরেন পাভেল পার্থ।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের গ্রাফিতিতে আদিবাসী আত্মপরিচয়, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি, ভূমি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি এবং সামরিকায়নের প্রশ্ন উঠে এসেছে। ‘কল্পনা চাকমা কোথায়’, ‘জাস্টিস ফর কল্পনা চাকমা’ ও ‘ইনডিজেনাস লাইভস ম্যাটার’-এর মতো বার্তা অধিকার, স্বীকৃতি ও বিচারহীনতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। ‘পাহাড়ে কবে মুক্তি মিলবে’ এবং ‘পরাধীন পাহাড়’-এর মতো গ্রাফিতিও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
পাভেল পার্থের মতে, জুলাইয়ের বহুত্ববাদ, অন্তর্ভুক্তি ও জাতিগত সংহতির আকাঙ্ক্ষা কার্যকর রাখতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও কণ্ঠকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
বখতিয়ার আহমেদ বলেন, রাষ্ট্র মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শন স্বীকার ও ধারণ করে এগোতে পারলে একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হতে পারত। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে তৈরি হওয়া জনআকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্যবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অথচ রাষ্ট্র তখন তার বক্তব্য ও দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনেনি। তিনি শুধু একটি অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর কথা বলেননি; দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তা, অধিকারহীন জনগোষ্ঠী ও মেহনতি মানুষের অধিকারের কথাও বলেছেন।
বখতিয়ার আহমেদ বলেন, আজ যে বহুত্ববাদের কথা বলা হচ্ছে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৭২ সালেই সেই কথা বলেছিলেন। রাষ্ট্রের প্রান্তসীমায় গেলে তার প্রকৃত চরিত্র স্পষ্ট হয়। তাই জনগণকে দেখার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা-নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে মানুষের অভিজ্ঞতা, মতামত ও অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের ওপর আস্থা রেখে তাদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ তৈরি করতে হবে।
সোহরাব হাসান বলেন, বহুত্ববাদের আলোচনা অনেক সময় মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। অবিবাহিত পরিচয়ের কারণে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা এবং বিভিন্ন কমিশনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয় উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত বহুত্ববাদ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
সংবিধানে সাম্য ও সমতার কথা থাকলেও বৈষম্যের সুযোগ রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আদিবাসীদের বাঙালি হিসেবে পরিচিত করার প্রসঙ্গ তুলে সোহরাব হাসান বলেন, কোনো জাতির পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির লক্ষ্যও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা সংরক্ষণ।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে মানবতাবাদী চিন্তক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্য, সমতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার দর্শন এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
দীপায়ন খীসা বলেন, জুলাই সনদে বাংলাদেশকে বহুজাতি, বহুধর্মী ও বহুভাষী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই বহুত্ববাদ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একটি জনগোষ্ঠী নিজের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজেরাই নির্ধারণ করবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া ও সম্মান করা। পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও গোয়েন্দা কাঠামোর প্রভাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংবিধান, সাম্য ও বৈষম্যহীন সমাজ নিয়ে যখনই আলোচনা হবে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনকে স্মরণ করতে হবে।
সাখাওয়াত টিপু বলেন, একটি রাষ্ট্রের সব জনগোষ্ঠী ভালো না থাকলে রাষ্ট্রও প্রকৃত অর্থে ভালো থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের চরিত্র বোঝা যায় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সেখানে কতটা নিরাপদে, শান্তিতে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারছেন, তার মধ্য দিয়ে। এ কারণেই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শন বর্তমান বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন তিনি।
ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা গরিব ও মেহনতি মানুষ, বেদে, জেলে এবং নারীদের অধিকারের কথা বলেছেন। সংবিধান প্রণয়নের সময়ও এসব মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্নে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তার দর্শনে নারী-পুরুষ, কৃষক-শ্রমিকসহ সব মানুষের অধিকার ও সমতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ফাল্গুনী ত্রিপুরার মতে, ২০২৪ সালের আন্দোলনে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনো ঘটেনি। আদিবাসী জনগোষ্ঠী নানা ধরনের নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এবং তাদের অধিকার সংকুচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার একদিকে ‘রেইনবো নেশন’-এর কথা বলছে, অন্যদিকে আদিবাসীদের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। সত্যিকার বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে কথার পাশাপাশি আদিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও পরিচয়ের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।


