ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ভোক্তাদের কেউ কেউ নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছেন। তবে সরকারের দাবি, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই।
গত সপ্তাহে এমন ভোগান্তিতে পড়েন সাভারের বেসরকারি চাকরিজীবী শাহিদা আখতার ও রামপুরার রাফিন আহমেদ। দুজনেরই বাসার সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন গ্যাস কিনতে গিয়ে বাড়তি দাম দিতে হয়েছে।
শাহিদা জানান, তিনি নিয়মিত যে কোম্পানির এলপিজি ব্যবহার করেন, সেটি দোকানে পাওয়া যায়নি। পরে তাকে নতুন সিলিন্ডারসহ গ্যাস কিনতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত ১২ কেজি এলপিজিসহ নতুন সিলিন্ডার কিনতে তাকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
শাহিদা বলেন, ‘মাস প্রায় শেষ। এ সময় ১২ কেজি এলপিজিসহ নতুন সিলিন্ডার কিনতে আমাকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এই কষ্টের কথা আমি কাকে বলব?’
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাস্তবে এই দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
তাদের দাবি, আগে নির্ধারিত দামের চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হলেও এখন বাড়তি দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। কোথাও কোথাও ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
শাহিদা বলেন, বাড়তি এই খরচ সামলাতে মাসের বাকি সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ কমাতে হবে তাকে।
রাফিন ২ হাজার টাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক জায়গায় শুনছি, ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছে। এটা তো ডাকাতি।’
আজিমপুরের একটি এলপিজি বিক্রয়কেন্দ্রেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হতে দেখেছেন মাহমুদ হোসেন। দাম কমানোর জন্য দর-কষাকষি করেও লাভ হয়নি।
কিছু এলাকায় বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ভোক্তারা।
বাড্ডার চায়ের দোকানি মো. ফয়সাল বলেন, ‘গতকাল খবরে দেখলাম, দেশে এলপিজির সরবরাহ প্রচুর। কিন্তু দোকানে গেলে শুনি সংকট। তাহলে কোনটা বিশ্বাস করব? দাম বাড়ানোর আগে আমরা সবসময় এমন পরিস্থিতি দেখি।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে এলপিজির সামগ্রিক সংকট নেই। তবে কিছু এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দাম নেওয়া হতে পারে।
বৃহস্পতিবার এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, দেশে এলপিজির সরবরাহ ‘পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক’।
লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ১ দশমিক ৫৮ লাখ টন ও সেপ্টেম্বরে ১ দশমিক ৫৬ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এই পরিমাণ আমদানি দেশের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট।
তবে ভোক্তা অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এলপিজি বাজারে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, এলপিজি বাজারের বড় অংশ অল্প কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা ও তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, ‘এই ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে একটি অলিগার্কি তৈরি হয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণ বা মোকাবেলার দায়িত্ব বিইআরসি ও কম্পিটিশন কমিশনের।’
দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় গণশুনানির বদলে কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাজার তদারকির দুর্বলতারও সমালোচনা করেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিইআরসির চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কমিশন সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে। সংস্থাটি এই খাতের লাইসেন্সিং কার্যক্রমও তদারক করে। তবে নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ থাকলেও নতুন কোনো কার্যকর পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিইআরসি নিয়ে আমরা সবসময়ই হতাশ। তারা শুধু দাম নির্ধারণ করে, কিন্তু তা বাস্তবায়নে কোনো কাজ করে না।’
তিনি জানান, জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের বাজার তদারকির নির্দেশ দিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এখনো তেমন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘নির্দেশনা দুই-তিন দিন আগে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো মাঠে কোনো কার্যক্রম বা তদারকি দেখতে পাচ্ছি না।’


