‘এই ফোনটি যার, সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, আপনারা দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান, অন্যথায় লাশও পাবেন না।’ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে ফোনে এ কথা শুনেছিলেন মাহামুদুর রহমান সৈকতের পরিবারের সদস্যরা। এর কিছুক্ষণ আগেও ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয় সাবরিনা আফরোজ সেবন্তীর। কিন্তু সেই ফোনকলের পর তারা জানতে পারেন, পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন সৈকত।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ ট্রাইব্যুনালের জবানবন্দি দেন ২৪ বছর বয়সী ইউনিভার্সিটি শিক্ষার্থী সেমন্তী। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও হত্যার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলেনূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে এই জবানবন্দি দেন তিনি। শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ।
জবানবন্দিতে সেমন্তী বলেন, ‘১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার আমার ভাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা তাকে বাধা দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্নীকে ছাত্রলীগের নির্যাতনের পর তার রক্তাক্ত ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ছবি দেখে সৈকত আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।’
সেমন্তীর ভাষ্য, সৈকত নিজেও একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। আন্দোলনটি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক কোটা সংস্কার আন্দোলন বলে মনে করতেন তিনি। তাই নিজেকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে পারেননি। ওই দিন বিকালে মাকে না জানিয়ে বন্ধু মো. আরাফাত হোসেনের সঙ্গে বাসা থেকে বেরিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন সৈকত।
আন্দোলনস্থল থেকে তিনি মাকে ফোন করে বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে বলেন। আশপাশে তখন ব্যাপক গোলাগুলি চলছিল। সাবরিনার জবানবন্দি অনুযায়ী, পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছিলেন। তার মা ছেলেকে ধমক দিয়ে বাসায় ফিরে আসতে বলেন। সন্ধ্যার পর সৈকত বাসায় ফেরেন।
সেদিন রাতে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের খালার একটি ফেসবুক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। ওই পোস্টে ফারহান ফাইয়াজের গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়ার কথা লেখা ছিল। পোস্টটি দেখে সৈকত আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সেমন্তী।
পরদিন ১৯ জুলাই, শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে নূরজাহান রোডের দক্ষিণ মাথায় স্টেপ জুতার দোকানের সামনে আন্দোলনে যোগ দিতে বাসা থেকে বের হন সৈকত।
সেমন্তী বলেন, ‘মা বারবার ফোন করলেও সৈকত ফোন ধরছিলেন না। পরে মা আমাকে ফোন করেন। তখন বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে ছিলাম। ভাইকে ফোন করে আমিও বাসায় ফিরে যেতে বলি। সৈকত জানান, কিছুক্ষণ পর বাসায় চলে যাবেন। সৈকতের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় ওই দিন বেলা ৩টা ২৬ মিনিটে।’
সেমন্তীর জবানবন্দি অনুযায়ী, তাদের বাবা বারবার সৈকতের ফোনে কল করছিলেন। একপর্যায়ে এক সহযোদ্ধা ফোনটি ধরে জানান, ফোনের মালিক পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যেতে বলেন তিনি; তা না হলে লাশও পাওয়া যাবে না বলে সতর্ক করেন।
সেমন্তী বলেন, ‘হাসপাতালে গিয়ে মর্গের সামনে স্ট্রেচারে সৈকতের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাই। ভাইয়ের মাথার বাম পাশে কানের ওপর দিয়ে গুলি ঢুকে ডান পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যাওয়ার পথে আমি বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশকে গুলি করতে দেখি।’
হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ভাইয়ের লাশের পাশে শহীদ রাজুর লাশসহ আরও পাঁচটি লাশ দেখতে পান সেমন্তী। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন ছিল বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ রাজু ছিলেন মোহাম্মদপুরের একজন আন্দোলনকারী।
সেমন্তী বলেন, হাসপাতাল থেকে তখন কোনো কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিন পর হাসপাতাল থেকে সৈকতের মৃত্যু সনদ দেওয়া হয়। সেখানে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘গানশট’ লেখা ছিল। ৫ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভাইয়ের মৃত্যু সনদ আনতে গিয়ে সেখানে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পান বলে জানান সেমন্তী।
সৈকত হত্যার জন্য সেমন্তী পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) রওশানুল হক সৈকতকে দায়ী করেন।
জবানবন্দিতে তিনি আরও যাদের নাম উল্লেখ করেন, তারা হলেন আওয়ামী লীগের শেখ বজলুর রহমান, আজিজুল হক রানা, এম এ সাত্তার, তৎকালীন কমিশনার আসিফ, কমিশনার সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্টন, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস বিপ্লব, মো. তোফায়েল সিদ্দিক তুহিন, ইসমাইল হোসেন, বিচ্ছু জালাল, মাঈনুল হাসান রাসেল, কে এম ফজলে রাব্বি ও মো. সাজ্জাদ হোসেনসহ আরও অনেকে।
সেমন্তী জানান, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, পত্রিকার প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তিনি তাদের নাম জানতে পেরেছেন। তার অভিযোগ, এসব ব্যক্তি তার ভাইসহ অন্য আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছেন। শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতসহ জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি সর্বোচ্চ শাস্তি, ফাঁসি চান।
মোহাম্মদপুরে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ২৮ আসামির মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন এবং যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বি। বাকি আসামিরা পলাতক।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সাবেক এডিসি রওশানুল হক সৈকত।


