পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় কেবল ছয়দিনের ব্যবধানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নয় বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একদিনে তিনজন এবং আরেকদিন দুইজন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ বিভিন্ন মামলায় বিচারাধীন হাজতি রয়েছেন।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, মৃতদের প্রত্যেকেরই আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা ও চিকিৎসার ইতিহাস ছিল।
কারাগারে মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রায়ই স্বজনদের পক্ষ থেকে নির্যাতন বা চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়, তবে কারা কর্তৃপক্ষ নির্যাতনের অভিযোগগুলো স্বীকার করে না। অথচ বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, কারাগারে চিকিৎসার অপ্রতুলতার অভিযোগ অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই।
সাবেক কারা মহাপরিদর্শক মো. মোতাহার হোসেনের তথ্যমতে, দেশের ৭৫টি কারাগারের চিকিৎসকদের ১৬১ পদের মধ্যে ১৫৯টিই শূন্য। অর্থাৎ সারাদেশে কেবল দুইজন চিকিৎসক এই মুহূর্তে কর্মরত আছেন, বিপরীতে বন্দীর সংখ্যা প্রায় লাখ খানেক।
কারা কর্তৃপক্ষ নানা সময় হঠাৎ করে অনেক বন্দীর অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা জানায়। সময়মতো চিকিৎসক এবং সেবা নিশ্চিত করতে পারলে তাদের অনেককেই বাঁচানো যেত কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই সংকট কাটাতে সরাসরি নন-ক্যাডার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য প্রেষণ বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব জমা দিয়েছে কারাদপ্তর। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে এখনও সাড়া আসেনি।
বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলান টাইমসকে বলেন, ‘অনেক বন্দী আগে আহত বা অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে ঢোকেন এবং ভেতরে চিকিৎসা পান না। আবার অনেকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ঢুকে কারাগারের ভেতরের নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে মারা যান।’
কারাগারগুলোতে চিকিৎসকদের তীব্র ঘাটতি পুরো চিকিৎসা সেবাকে অচল করে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো বন্দী গুরুতর অসুস্থতায় ভুগলে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়াতেই সময় নষ্ট হয়। এটি মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।’
গত সোমবার সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দীর মৃত্যু হয়। তারা হলেন- ৫৪ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম ও ৬০ বছর বয়সী আব্দুর রহিম।
কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় কারারক্ষীরা রফিকুলকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পত্র নবিস গ্রামে।
বন্দী আব্দুর রহিমকে গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেলের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। তিনি রাজধানীর গেন্ডারিয়া ডিআইটি প্লট এলাকায় থাকতেন।
এর একদিন আগে রোববার কারাগারেই মারা যান আব্দুল মাবুদ নামে ৫৮ বছর বয়সী এক হাজতি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়।
শনিবার রাতে ঢাকা মেডিকেলের করোনারি কেয়ার ইউনিটে মারা যান ৭০ বছর বয়সী আব্দুল বারেক। সেদিনই তাকে হাসপাতালে আনা হয়। বারেক একটি হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে ছিলেন। তার বাড়ি নেত্রকোণায়।
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে কারাগারে মারা যান হাজতি আলী আকবর মণ্ডল (৬৭)। তাকে পরে হাসপাতালে আনা হয়। তার বাড়ি মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী এলাকায়।
৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে মারা যান তিনজন। তারা হলেন- ৫৮ বছর বয়সী আবুল বাশার, ৬২ বছর বয়সী আব্দুল কাইয়ুম ও ৫২ বছর বয়সী মো. শাহাদত হোসেন লিটন।
বাশারকে সকালে কারারক্ষীরা হাসপাতালে নিয়ে আসেন, কিছুক্ষণ পরেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার কুটিয়া লক্ষ্মীপুর গ্রামে। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় বন্দী ছিলেন।
কাইয়মকেও আনা হয় প্রায় একই সময়ে। তাকে সকাল ৯টার দিকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গোলাই পদাবাজার গ্রামে। তিনি আটটি মামলায় বন্দী ছিলেন।
আর শাহাদতকে হাসপাতাল ভর্তি করা হয় গত ২৮ আগস্ট। তিনি মেডিসিন বিভাগের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন। তিনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ও উত্তরা থানায় করা একটি মামলায় বন্দী ছিলেন। তার বাড়ি খুলনার দৌলতপুর থানার পাবলা গ্রামে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর কারাগারে মারা যান ৪৫ বছর বয়সী বাবুল হোসেন। তাকেও পরে হাসপাতালে আনা হয়। এই বন্দী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার একটি মাদক মামলার আসামি ছিলেন। তার বাড়ি যশোরের কোতোয়ালি থানার মনোহরপুর এলাকায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, এভাবে যারা মারা যান তাদের ময়নাতদন্ত করে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
তাদের মৃত্যুর বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের জেলার মাসুদ হাসান জুয়েল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মৃত বন্দীদের প্রত্যেকেরই পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস ও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা ছিল। কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। কেউ কেউ বয়স্ক ছিলেন, আবার কয়েকজন গুরুতর রোগে ভুগছিলেন।’
বন্দীদের প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার বাইরের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, ‘কোনো বন্দীই সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় কারাগারে এসে হঠাৎ মারা যাননি।’
প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় নিয়ম অনুযায়ী অপমৃত্যু মামলা করা হয়। এসব মামলার তদন্ত করে পুলিশ।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, দেশের কারাগারগুলোতে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে মারা গেছেন ৭৯ বন্দী, যাদের মধ্যে ৪৭ জন বিচারাধীন ছিলেন।
কারাদপ্তরের নিজস্ব হিসাব বলছে, গত ৫ বছরে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেছেন ৪৯১ জন বন্দী। নির্ধারিত কোনো অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের রিকশা, ভ্যান বা যখন যে যানবাহন পাওয়া যায় তা দিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। যার ফলে অনেক সময় বন্দীদের হাসপাতালে নিতে সময় বেশি লাগে।
এই বিলম্বও মৃত্যুর একটি কারণ হতে পারে বলে স্বীকার করেন কারা কর্মকর্তারাই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ‘প্রত্যেকটি কারাগারে চিকিৎসকসহ একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দল থাকা জরুরি। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় অন্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকতে হবে। একই সঙ্গে কিছু জরুরি ও সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।’
কারাগারের ভেতরে পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া বন্দীদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে অনেক মৃত্যুও ঠেকানো যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।


