গভীর রাতে হাত-পা বেঁধে নদীতে নিয়ে মাথায় গুলি করা, পেট কেটে সিমেন্টের বস্তাসহ লাশ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে র্যাবের তথাকথিত ‘গলফ’ অভিযানের নামে এসব গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী এক অবসরপ্রাপ্ত মেজর।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তৎকালীন র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. সাব্বির রহমান ওসমানী। তার দীর্ঘ সাক্ষ্যে জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে তার পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় নদীতে একের পর এক মানুষ হত্যা করে লাশ গুম করা এবং সুন্দরবনে সাজানো ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে।
শুনানিকালে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহাদী ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
৫৪ বছর বয়সী সাব্বির রহমান ওসমানী ১৯৯৩ সালের ১৮ জুন ২৮তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন। চাকরির ১৬ বছর পর ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে র্যাবে বদলি করা হয় এবং তিনি র্যাব-৮-এর উপ-অধিনায়ক হিসেবে বরিশালে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি খুলনায় বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে কর্মরত।
প্রথম ‘গলফ’ অভিযান ও হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান জানান, ২০১০ সালের জানুয়ারির দিকে এক রাতে র্যাব-৮ ব্যাটালিয়ন সদরে সরকারি গাড়ি ও মাইক্রোবাস নিয়ে হাজির হন তৎকালীন গোয়েন্দা পরিচালক জিয়াউল আহসান। জিয়ার নির্দেশে কোনো আভিযানিক দল ছাড়াই ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক ও সাব্বির তার সঙ্গে বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটের উদ্দেশে রওনা হন। পেছনে পেছনে ঢাকা থেকে আসা র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একটি মাইক্রোবাসও চলতে থাকে।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছে দেখা যায়, আগে থেকেই একটি ফিশিং ট্রলার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকা থেকে আসা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা হাত বাঁধা ও মাথায় কালো টুপি পরানো এক ব্যক্তিকে মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে ট্রলারের মাছ রাখার খোলে বন্দি করে ফেলেন। এরপর ট্রলারটি চরদুয়ানী খাল থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনার দিকে রওনা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা চলার পর জিয়াউল আহসানের নির্দেশে সাব্বির ট্রলারের ব্রিজ থেকে নেমে লগি দিয়ে পানির গভীরতা মেপে তাকে জানাতে থাকেন।
পানির গভীরতা ও জোয়ার-ভাটার হিসাব শেষ হলে জিয়ার সংকেতে খোলের ভেতর থেকে ওই ব্যক্তিকে বের করা হয়। জবানবন্দিতে সাব্বির বলেন, ট্রলারের পাটাতনে আনার পরপরই চারজন র্যাব সদস্য তাকে ঘিরে ফেলেন। প্রথম সদস্য লোকটির গলা ও পায়ে দুটি সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে দেন। দ্বিতীয় সদস্য মাথায় একটি ছোট বালিশ বা কুশন ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড গুলি করেন। তৃতীয় সদস্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির পেট কেটে ফেলেন এবং চতুর্থ সদস্য কাটার সঠিকতা নিশ্চিত করতে পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পরীক্ষা করেন।
সবকিছু শেষ হলে পুনরায় পানির গভীরতা মেপে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে সিমেন্টভর্তি বস্তাসহ রক্তাক্ত দেহটি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ফেরার পথে পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে পড়লে জিয়া নিজেই বলেন, ‘এরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর, এদের না থাকাই ভালো। এভাবেই এদেরকে গলফ করতে হবে।’ এটিই ছিল ‘গলফ’ শব্দের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীর প্রথম পরিচয়।
একই স্থানে চারজনকে হত্যা ও বলেশ্বরে ভেসে ওঠা লাশ
২০১০ সালের মে মাসে একইভাবে রাত সাড়ে নয়টার দিকে পুরো ব্যাটালিয়ন সদরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে অত্যন্ত গোপনে দুটি মাইক্রোবাসে করে চারজন ব্যক্তিকে চরদুয়ানী ঘাটে নিয়ে আসা হয়। তাদের পরিচয় যেন বোঝা না যায়, সে জন্য মুখ ঢেকে ও হাত পেছনে বেঁধে ফিশিং ট্রলারের খোলে পুরে দেওয়া হয়।
প্রতিকূল আবহাওয়া ও নদীতে প্রচণ্ড ঢেউ থাকা সত্ত্বেও ট্রলার মোহনার দিকে নিয়ে গিয়ে একই প্রক্রিয়ায় প্রথম তিনজনকে মাথায় গুলি করে, পেট কেটে ও সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। চতুর্থ ব্যক্তিকে খোল থেকে বের করতে গিয়ে কিছুটা বেগ পেতে হলে পরে দেখা যায় তিনি বেশ সুঠামদেহের অধিকারী ছিলেন। তাকেও একইভাবে হত্যা করে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার দুই-তিন দিন পর বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা, পেট কাটা ও সিমেন্টের বস্তা বাঁধা একটি লাশ ভেসে উঠলে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। পরে জিয়াউল আহসানকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি রিপোর্ট না করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে গোয়েন্দা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়, বিজিবির গোয়েন্দা শাখা ডিএনএ পরীক্ষা করে লাশটি সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুলের বলে শনাক্ত করেছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী মাঝিকে ‘এলিমিনেট’
২০১১ সালের জুনে জিয়াউল আহসান হঠাৎ সাব্বিরকে ফোন করে আলকাছ মাঝি নামে এক ব্যক্তির তথ্য জানতে চান। আলকাছ মাঝি ছিলেন গলফ অভিযানে ব্যবহৃত ট্রলারগুলোর নিয়মিত চালক। জিয়া সাব্বিরকে জানান, আলকাছ বাজারে গলফ অপারেশনের গোপন তথ্য ফাঁস করছেন, যা র্যাবের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি। তাই আলকাছকে ‘এলিমিনেট’ বা হত্যা করার নির্দেশ দেন জিয়া।
সাব্বির শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে আকুতি-মিনতি করে এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। এর কিছুদিন পরই আলকাছ নিখোঁজ হন। তার স্ত্রী র্যাব-৮ কার্যালয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে জানান, জিয়াউল আহসান ডেকে পাঠানোর কথা বলেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন আলকাছ, এরপর আর ফিরে আসেননি।
সুন্দরবনে তিন সাজানো ‘এনকাউন্টার’
সাব্বির রহমান তার জবানবন্দিতে সুন্দরবনের নিশানখালী (২০১১), কটকা (২০১২) এবং মরা ভোলায় (২০১২) পরিচালিত তিনটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাকে সম্পূর্ণ সাজানো বলে দাবি করেন।
তিনি জানান, এসব অভিযানে মূল বাহিনী পৌঁছানোর আগেই র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একটি দল বনের ভেতর অবস্থান নিত। মূলত তাদের বাজানো হুইসেল বা সংকেত পাওয়ার পরপরই যৌথবাহিনী বনের নির্দিষ্ট জায়গা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করত।
২০১১ সালের নিশানখালী অভিযানে পুলিশকে দুটি লাশ উদ্ধারের কথা বলা হলেও থানায় মামলার সময় ছয়টি লাশ দেখানো হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, অতিরিক্ত চারটি লাশ আগে থেকেই ঘটনাস্থলে এনে হত্যা করে রাখা হয়েছিল।
একইভাবে কটকা অভিযানে চারজনকে ট্রলারে হত্যা করে ফেলার পর, পঞ্চম ব্যক্তিকে হাত বাঁধা অবস্থায় বনের গভীরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। মরা ভোলা অভিযানেও হেলিকপ্টার দিয়ে রেকি করার নাটক বানিয়ে সাজানো গোলাগুলি চালানো হয়।
সাব্বির উল্লেখ করেন, এসব সাজানো নাটকে প্রথিতযশা সাংবাদিকদের র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের তৎকালীন পরিচালক কমান্ডার সোহাইলের মাধ্যমে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে ট্রলারে করে পেছনে রাখা হতো। অথচ গোলাগুলি চলাকালেই জিয়াউল আহসান ও সোহাইল কোনো ধরনের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বা হেলমেট ছাড়াই সাধারণ পোশাকে বনের ভেতর ঘুরে বেড়াতেন। বনদস্যুদের কাছে কখনোই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থাকত না, অথচ উদ্ধার তালিকায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দেখানো হতো।
চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর
জবানবন্দির শেষভাগে সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী ঊর্ধতন কমান্ডোরের নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকলেও এসব নারকীয় হত্যাকাণ্ড তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। তৎকালীন ব্যাটালিয়ন অধিনায়কও তাকে বলেছিলেন, ‘জিয়াকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে!’
এই চরম মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এবং অনুশোচনা থেকে বাঁচতে সেনাবাহিনীতে ১৮ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার পরপরই ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেন এবং ২০১৪ সালের মার্চে এলপিআরে চলে যান।


