পিপিডির নির্বাহী পরিচালকের অপসারণ চায় ঢাকা

পিপিডির নির্বাহী পরিচালকের অপসারণ চায় ঢাকা
কার্টুন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

আন্তসরকার সংস্থা ‘পার্টনার্স ইন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (পিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক (ইডি) জোসেফ আকিনকুগবে অ্যাডেলেগানকে তলব করেছে বাংলাদেশের একটি আদালত।

গত ৪ আগস্ট ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত তহবিল তছরুপসহ অন্যান্য অভিযোগে আনা আবেদনের শুনানির জন্য তাকে আগামী ৩০ নভেম্বর আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এবং স্থানীয় তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলা ও একটি দেওয়ানি মামলা করা হয়েছে। ফৌজদারি মামলাগুলোর অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

এ বছরের মে মাসে পিপিডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আদালতে একটি মামলা করেন। যেখানে অ্যাডেলেগান ও তিন স্থানীয় কর্মচারীকে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সংস্থার তহবিল তছরুপের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত পরবর্তী সময়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়।

আগস্ট মাসে পিপিডির আরেক কর্মকর্তা অ্যাডেলেগান ও অপর তিন কর্মীকে অভিযুক্ত করে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকির অভিযোগে দ্বিতীয় মামলাটি করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) পাঠান।

এ ছাড়া, পিপিডির নির্বাহী পরিচালকের কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও দায়মুক্তি-সংক্রান্ত দাবির বিষয়ে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) অনুসন্ধানে নেমেছে।

এসবির একটি সূত্র বিষয়টিকে কেন্দ্র করে টাইমসকে নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশে তার অবস্থান, কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও দায়মুক্তির ব্যবহার এবং পিপিডির আইনি মর্যাদা সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়ে অ্যাডেলেগানকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পিপিডির সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মেনে চলা হচ্ছে কিনা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের সঙ্গে সম্ভাব্য সাংঘর্ষিক কোনো কর্মকাণ্ড আছে কিনা, তা-ও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

নাইজেরিয়ার নাগরিক অ্যাডেলেগান গত বছরের ৯ অক্টোবর পিপিডির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। এরপর থেকে তাকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

টাইমসের পর্যালোচিত নথিপত্রে দেখা যায়, পদটির জন্য প্রযোজ্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৫৫ বছর, অথচ নিয়োগের সময় অ্যাডেলেগানের বয়স ছিল ৫৯ বছর। কোনো স্পষ্ট ভিত্তি ছাড়াই একটি ‘বিশেষ সিদ্ধান্তে’ এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ উদ্যোগে জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্যে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পিপিডি প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯৬ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে বাংলাদেশ এর সচিবালয় আয়োজন করে আসছে। ২০০১ সালে পিপিডি একটি স্বাধীন আন্তসরকার সংস্থায় পরিণত হয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাগতিক দেশের কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে।

আরও পড়ুন

মন্ত্রণালয় অপসারণ চায়

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গত আগস্টে পিপিডি বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহামেদ দুয়াজির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নির্বাহী পরিচালকের বিরুদ্ধে নীতি লঙ্ঘন, প্রশাসনিক অনিয়ম ও আর্থিক অব্যবস্থাপনার তদন্তের অনুরোধ জানায়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, পিপিডি বোর্ড চেয়ারের প্রেরিত সুপারিশ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে আরেকটি চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চেয়ারের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠাতে যাচ্ছি যাতে নির্বাহী পরিচালকের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ, আমাদের কাছে গুরুতর অনিয়ম, তহবিল তছরুপ ও স্বাগতিক দেশের সঙ্গে অসহযোগিতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে।’

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বোর্ড চেয়ার সম্প্রতি ঢাকা ও নির্বাহী কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তার সিদ্ধান্ত শেয়ার করেছেন এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নির্বাহী পরিচালকের তাত্ক্ষণিক বরখাস্ত এবং একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।

বোর্ড চেয়ার বিতর্ক

সংস্থাটির পরিচালনা, আর্থিক কর্মকাণ্ড, কর্মকর্তা ছাঁটাই ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিউনিসিয়ার প্রতিনিধি ও তৎকালীন পিপিডি চেয়ারম্যান মোহামেদ দুয়াজি ২০২৬ সালের ২৮ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় পিপিডি সচিবালয় পরিদর্শন করার পর এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়।

তার সফরের পর, পিপিডির ওয়েবসাইটের নির্বাহী কমিটির নেতৃত্বের তালিকা থেকে দুয়াজির নাম সরিয়ে জিম্বাবুয়ের ড. ডগলাস মোম্বেসোরাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দেখানো হয়। তবে ওয়েবসাইটের অন্য একটি অংশে দুয়াজিকে চেয়ারম্যান হিসেবে তালিকাভুক্ত রাখা অব্যাহত ছিল।

এই ধরনের অসংগতিপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কোনো আনুষ্ঠানিক বোর্ড সভা, ভোটাভুটি বা প্রস্তাবের মাধ্যমে এই পরিবর্তন অনুমোদন করা হয়েছিল কি না, এবং স্বাগতিক দেশ ও নির্বাহী কমিটির স্থায়ী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়েছিল কি না।

আর্থিক ও কর্মী সংক্রান্ত অভিযোগ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার মতে, অ্যাডেলেগান তার বার্ষিক বেতন প্রায় ৮৬ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ডলারে উন্নীত করেন, তবে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদনের কোনো কাগজপত্র বাংলাদেশকে দেননি।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, পিপিডির ইনস্টলেশন গ্রান্ট বা পদায়ন অনুদান ৯ হাজার ডলার নির্ধারিত থাকলেও অ্যাডেলেগান কোনো প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই ২৭ হাজার ডলার উত্তোলন করেন।

অন্য একটি অভিযোগ পিপিডির শিক্ষা ভাতা নীতি সম্পর্কিত, যা কেবল ২১ বছরের কম বয়সী সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য। কর্মকর্তা দাবি করেন, অ্যাডেলেগানের মেয়ের বয়স ২১ বছর পার হওয়ার পরও তিনি ওই ভাতা নেওয়া অব্যাহত রাখেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ৪১তম নির্বাহী কমিটির সভায় অ্যাডেলেগান স্বাগতিক দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই ওই বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৮ বছর করেন।

ওই একই সভায় স্বাগতিক দেশ হিসেবে পিপিডিতে বাংলাদেশের ভূমিকাকে প্রভাবিত করে এমন কিছু নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়; যার মধ্যে স্বাগতিক সদস্যের মতামত বা বোর্ডের সঠিক অনুমোদন ছাড়াই বেশ কয়েকটি জায়গায় বাংলাদেশকে ‘ভোটাধিকারহীন দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ইডির ক্ষমতা অপব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, পিপিডির বর্তমান আইটি ও কমিউনিকেশন প্রধানের পদোন্নতি ও মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি গত ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক বোর্ড চেয়ার পরবর্তী বোর্ড সভায় তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সেই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই অ্যাডেলেগান নিজে থেকে সেই পদোন্নতি প্রদান করেন বলে টাইমসের পর্যালোচিত নথিতে দেখা যায়।

অনুরূপ উদ্বেগ রয়েছে নির্বাহী পরিচালকের নির্বাহী সহকারীকে নিয়েও, যাকে কোনো প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপিত প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়াই পদোন্নতি বা স্থানান্তর করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের নভেম্বরের এক চিঠিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পিপিডির কর্মী ম্যানুয়াল লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে, তার আচরণকে ‘গুরুতর অসদাচরণ’ বলে অভিহিত করে এবং সচিবালয়কে অনুশাসনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে স্বাগতিক দেশকে অগ্রগতি জানানোর আহ্বান জানায়। নথিপত্র থেকে জানা যায়, পরবর্তীতে অ্যাডেলেগানের অধীনেই তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেন, অ্যাডেলেগান বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন এবং অর্থ প্রধান ও প্রোগ্রাম প্রধানের মতো জাতীয় পদগুলোতে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ দেন, যা সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশিদের দিয়ে পূরণ হওয়ার কথা ছিল।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ ও ফোনে অ্যাডেলেগানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad