সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সময়কাল তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে করা একটি অভিযোগের বিষয় ছিল এমন একটি পদোন্নতি, যা তিনি উপদেষ্টার পদ ছাড়ার কয়েক মাস পর এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর হয়েছে।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন আসিফ। সংবাদ সম্মেলনে দুদকের অনুসন্ধানের বিপরীতে নিজের বক্তব্যের সমর্থনে ডিজিটাল প্রেজেন্টেশন তুলে ধরেন তিনি।
এসময় আসিফ মাহমুদ বলেন, তিনি ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়। অথচ ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পছন্দমতো পদায়নের বিনিময়ে প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়ার প্রস্তুতির অভিযোগ করা হয় ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল। সংশ্লিষ্ট পদোন্নতির সরকারি আদেশ হয় ১১ মে।
‘আমি ১০ই ডিসেম্বর ২০২৫ উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করি এবং ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে,’ বলেন তিনি। ‘যেই অর্ডারটা ২০২৬ সালের ১১ই মে হলো, তখন সরকারের বয়স তিন মাস।’
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, অভিযোগে বলা হয়েছিল ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য জনপ্রতি ১ লাখ টাকা এবং পছন্দমতো স্থানে পদায়নের জন্য জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা হিসেবে মোট প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। তিনি বলেন, অভিযোগটি করা হয়েছিল পদোন্নতির আদেশের আগেই।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসে থাকা অবস্থায় পদোন্নতি করিয়ে আমি কিভাবে ২ কোটি টাকা নেই?’ তার দাবি, ওই পদোন্নতির বিষয়ে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সেটির সঙ্গে তখনকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা উচিত, তার নয়।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ ১১ মে ২০২৬-এর সরকারি আদেশও তুলে ধরেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই আদেশে ১৩৫ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দিয়ে তাদের নামের পাশে উল্লেখ করা কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। আসিফ মাহমুদ বলেন, অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুসন্ধান শুরু করার কথা থাকলে তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের সময়কালও বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘এই যাচাই বাছাইটা তারা কোথায় করলো? যাচাই বাছাই যদি করতো তাহলে ১১ই মে ২০২৬ তারিখে হওয়া কোন পদোন্নতির জন্য যদি তদন্ত করতে হয়, তাহলে এখন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যে বসে আছে তার বিরুদ্ধে করা উচিত।’
এর আগে তার বিরুদ্ধে করা আরেকটি অভিযোগের বিষয়েও নথি তুলে ধরে বক্তব্য দেন আসিফ মাহমুদ। তার দাবি, অভিযোগে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে প্রত্যেকের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা করে মোট ৭৬ লাখ টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে আসিফ মাহমুদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে ৩৮ জন নয়, ১১২ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ওই চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ২০২১ সালে ১১২ জনকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার পর এ বিষয়ে মামলা হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে রায় হয় এবং পরে আপিলের প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর মামলাটি নিষ্পত্তি হয়। এর পরদিন, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, মন্ত্রণালয় ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বরের আদেশটি বাতিল করে।
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের যে রায়, সেই রায় অনুযায়ী তারা রায়টা জাস্ট বাস্তব করেছে এই অর্ডারটা দিয়ে।’
সংশ্লিষ্ট আদেশটি সচিবের স্বাক্ষরে জারি হয়েছিল বলেও দাবি করেন আসিফ মাহমুদ। তার ভাষ্য, এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত উপদেষ্টা পর্যায়ে আসে না, সচিব পর্যায়েই তা নিষ্পত্তি হয়।
দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্য নিয়েও অভিযোগ করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, শুরুতে দুদকের মুখপাত্র এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি দুদককে ওই কথিত প্রমাণ প্রকাশ করার আহ্বান জানান।
আসিফ মাহমুদের দাবি, এরপর দুদকের মুখপাত্র সাংবাদিকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লিখেছিলেন যে কথা বলতে গিয়ে তিনি সম্ভবত ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি ভুল করে বলেছেন এবং সাংবাদিকদের ভিডিও বা ক্লিপ থেকে ওই অংশ বাদ দিতে বলেছিলেন।
‘উনি হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সট দিয়ে উনার এত বড় একটা ভুলকে জাস্ট দায় সেরে চলে গেলেন,’ বলেন আসিফ মাহমুদ। তার দাবি, পরে দুদকের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো রিজয়েন্ডার বা সংশোধনী দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ওই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তার বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। ‘এর আগেই কিন্তু সারাদেশে নিউজ হয়ে গেছে, উনার ওই বক্তব্য ভিডিও আকারে প্রচার হয়ে গেছে কোটি কোটি মানুষের কাছে যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে,’ বলেন তিনি।
এ বিষয়ে তিনি দুদকের কাছে প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংশোধনের উদ্যোগ চেয়েছিলেন বলেও জানান। তার ভাষ্য, সে বিষয়ে দুদকের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়ার পর তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথা জানান।


