তিন স্তরে চাঁদাবাজি, টাকা না দিলে হামলা

তিন স্তরে চাঁদাবাজি, টাকা না দিলে হামলা
ফাইল ফটো
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক চাঁদাবাজির তদন্তে এমন তিন স্তরের কাঠামোর তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে জেলা পুলিশ। শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনার মিল পেয়েছে পুলিশ।

সোমবার রাতে এই চক্রের সাত সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর আরও তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে সাগর ও শাকিল বড় সাজ্জাদ, রায়হান ও ডেভিড ইমনের হয়ে তথ্য সংগ্রহ, চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি দেখানোর কাজে যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, প্রথম স্তরের সদস্যরা টার্গেট ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করেন। দ্বিতীয় স্তর থেকে চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তৃতীয় স্তরের সদস্যরা ভয়ভীতি, হামলা কিংবা গুলির ঘটনা ঘটান। গ্রেপ্তার সাগর ও শাকিল এই দুই স্তরে কাজ করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের ধারণা, মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সামনে রেখে মূল হোতারা আড়ালে থাকেন। টার্গেট ব্যক্তির পরিচয়, আর্থিক সামর্থ্য, পরিবারের সদস্য, ব্যবসা ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার পর যোগাযোগ করা হয়।

এক চিকিৎসকের অভিযোগেও একই পদ্ধতির তথ্য পেয়েছে পুলিশ। লিখিত অভিযোগে তিনি জানান, প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। পরে বিদেশি নম্বর থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে রোগী সেজে চেম্বারে গিয়ে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ১০০ পুলিশ নিরাপত্তা দিলেও তাকে রক্ষা করা যাবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বায়েজিদ বোস্তামী ও হাটহাজারীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মুঠোফোন ও যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে চক্র সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ।

এর কয়েক দিনের মধ্যে বায়েজিদ বোস্তামীতে আরেক ব্যবসায়ী পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। ৩ সেপ্টেম্বরের সাধারণ ডায়েরিতে ব্যবসায়ী মাকসুদুর রহমানের স্ত্রী মাহফুজা খানম রুনা জানান, বিভিন্ন নম্বর থেকে তার স্বামীর কাছে ফোন আসছিল।

ফোনকারীরা নিজেদের ডেভিড ইমন, রায়হান ও বড় সাজ্জাদের লোক বলে পরিচয় দেন। একপর্যায়ে ব্যবসায়ীর ছেলের ছবি পাঠিয়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে সন্তানদের তুলে নেওয়া ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয়।

গত ২৯ জুলাই যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর সময় ডেভিড ইমনসহ তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে ইমনের কাছ থেকে মাসে গড়ে প্রায় এক কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ।

আরও পড়ুন

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বড় সাজ্জাদকে, ১৫ লাখ টাকা দল পরিচালনায় দেওয়া হতো। বাকি টাকা ইমনের কাছে থাকত। নগদে আদায় করা চাঁদার টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয়। ইমন ও রায়হান চট্টগ্রামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করতেন। কোথাও ২০ থেকে ৩০ জনের সশস্ত্র দল হামলা চালায়। কোথাও মোটরসাইকেলে গিয়ে গুলি করা হয়। তাই চাঁদা দাবিকারীদের পাশাপাশি শুটারদেরও শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

গত ১১ জুলাই বিদেশি নম্বর থেকে ডেভিড ইমন পরিচয়ে এক প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা ও মাসে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। দুই দিনের সময় দেওয়া হয়। টাকা না দেওয়ার পর ১৩ জুলাই দুপুরে ৩০ থেকে ৪০ জনের সশস্ত্র দল ডিডিএনের কার্যালয়ে হামলা চালায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে ভাঙচুরের পর প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর আগে ব্যবসায়ী ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের চন্দনপুরার বাসায় দুই দফা গুলি চালানো হয়। ২ জানুয়ারি প্রথম হামলার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি আবার হামলা হয়। মুজিবুরের অভিযোগ, চাঁদার টাকা না দেওয়ায় হামলা হয়েছে। দ্বিতীয়বার হামলার সময় বাড়িতে পুলিশি পাহারা ছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় হামলায় একটি এসএমজি, একটি চায়না রাইফেল, দুটি বিদেশি পিস্তল ও একটি শটগান ব্যবহার করা হয়। বাড়ি লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়া হয়।

ডেভিড ইমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা গেলেও এসএমজি, চায়না রাইফেল ও শটগানসহ ভারী অস্ত্রের হদিস মেলেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। নতুন করে গ্রেপ্তার সাতজনকে রিমান্ডে নিয়ে এসব অস্ত্রের অবস্থান জানার চেষ্টা করা হবে।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রাঙ্গুনিয়া, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা থাকতে পারে। এসব এলাকায় বড় অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। অভিযান চালাতে সময় লাগবে।

তদন্তে এখন চাঁদা দাবিকারীদের পরিচয়ের পাশাপাশি অস্ত্রের উৎস, সংরক্ষণের স্থান ও হামলাকারীদের শনাক্তের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে সব হত্যাকাণ্ড বা সহিংস ঘটনাকে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করছে না পুলিশ। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানীহাটে যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিমকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে এর সঙ্গে আগের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

মাসুদ আলম বলেন, মাদক ব্যবসার ভাগবাটোয়ারা ও মোটরসাইকেল চুরির বিরোধ থেকে করিম হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। তার বিরুদ্ধে মাদক, ধর্ষণ, চুরি-ছিনতাইসহ একাধিক মামলা থাকার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

উত্তর চট্টগ্রামের অপরাধ পরিস্থিতিতে তাই রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত পাশাপাশি রয়েছে। একই এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন কারণে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের দাবি, এর মধ্যে ২০টি রাজনৈতিক বিরোধের জেরে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

পুলিশ বলছে, ডেভিড ইমন, গলাকাটা মোবারক, ধামা ইলিয়াস ও বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের বড় একটি অংশ গ্রেপ্তার হয়েছে। রায়হান এখনো পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
সাত সহযোগী গ্রেপ্তারের পর চক্রটির পুরো কাঠামো শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ। তথ্য সংগ্রহ, চাঁদা দাবি, টাকা আদায়, হামলায় অংশগ্রহণ ও ভারী অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল, সেসব তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে তিন স্তরের কাঠামোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে চট্টগ্রামের চাঁদাবাজির সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ, অর্থের প্রবাহ, অস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষিত শুটারদের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের চিত্র সামনে আসবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর