একসময় স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অপেক্ষমাণ তালিকায় থেকেও শেষ পর্যন্ত সুযোগ পাননি। অনেকের কাছে এটি হয়তো ব্যর্থতার গল্প। কিন্তু সেই অপূর্ণতাই তাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। আজ তিনি বাংলাদেশের গারো (মান্দি) সম্প্রদায়ের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত- জেসি ডেইজি মারাক।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ভুটিয়া গ্রামের এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্ম জেসি ডেইজির। পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই শিক্ষক হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বড় হয়েছেন তিনি। নেত্রকোনার বিরিশিরি মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকার হলি ক্রস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। অষ্টম শ্রেণিতে পেয়েছিলেন ট্যালেন্টপুল বৃত্তি।
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা করায় তার লক্ষ্য ছিল চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে না পারায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। শুরুতে এই সিদ্ধান্ত অনেকটা বাধ্য হয়ে নেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ভাষা, সংস্কৃতি ও গবেষণার নতুন এক জগৎ তার সামনে উন্মোচিত হয়।
প্রথম বর্ষেই নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন জেসি ডেইজি। নিয়মিত ক্লাস, মনোযোগী অধ্যয়ন এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা অনুসরণ করে দ্রুতই বিভাগে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে ভাষাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি স্প্যানিশ ও জার্মান ভাষাও শেখেন।
২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়েন জেসি ডেইজি। তিনি গারো সম্প্রদায়ের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে ওঠেন। একই সময়ে ৩৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও তিনি সরকারি প্রশাসনের চাকরির পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন।
এই পেশাকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার গভীর আগ্রহ। তিনি বিশেষভাবে মান্দি (গারো) ভাষা, সংস্কৃতি এবং ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী। দেশের আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণ ও ভাষাবৈচিত্র্য নিয়ে তার কাজ ইতোমধ্যেই শিক্ষাঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের জন্য জেসি ডেইজি মারাকের জীবন এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে—সাফল্যের সংজ্ঞা একটিই নয়। লক্ষ্য বদলাতে পারে, কিন্তু অধ্যবসায়, শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা এবং নিজের পরিচয়ের প্রতি গর্ব একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে।


