সারা দেশে বিদ্যুৎ সংকটে ঢাকার বাইরের এলাকার মানুষের ভোগান্তি কিছুটা কমাতে এখন রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিডের হিসেব অনুযায়ী, বুধবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীতে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হয়।
রাত ৯টার পর ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ ছিল না।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বীথি আক্তার জানান, তার এলাকায় রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেই পারিনি। ঢাকায় এত দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হতে আমি আগে কখনো দেখিনি।’
একইভাবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা রাত ১০টার দিকে এক ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎহীন ছিলেন। এ ছাড়া ইস্কাটন গার্ডেন, মৌচাক, লালমাটিয়া, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, কাজীপাড়া এবং মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট এলাকায় রাত ৯টা থেকে রাত ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য জহুরুল ইসলাম ঢাকায় লোডশেডিং শুরুর কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট থাকায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। তাই ঢাকার বাইরের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ভোগান্তি কিছুটা কমানোর লক্ষ্যেই ঢাকায় লোডশেডিং শুরু করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে টানা কয়েকদিন ধরে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি হিসেব মতে, সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে রোববার তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট, সোমবার তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, মঙ্গলবার তিন হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট এবং বুধবার তিন হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়।
মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা হওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়, যার ফলে সরাসরি ব্যাহত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন।
ঢাকার বাইরে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনার পর পল্লী বিদ্যুতের (আরইবি) কর্মকর্তারা পুলিশের কাছে নিরাপত্তাও চেয়েছেন।
তবে ঢাকায় লোডশেডিং শুরু হওয়ার পর মফস্বলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে।
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল আমীন চৌধুরী জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার আমাদের ৬৯ মেগাওয়াট চাহিদার পুরোটাই পাওয়া গেছে, তাই কোনো লোডশেডিং করতে হয়নি।’
চাটমোহর উপজেলার বনথোর গ্রামের বাসিন্দা সাজিক চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত তার এলাকায় কোনো লোডশেডিং হয়নি।
এর আগে পাবনায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ছিল। মঙ্গলবার ঈশ্বরদীর সাহাপুর ইউনিয়নে বিদ্যুৎ না থাকার ক্ষোভে স্থানীয় মানুষ এক মিটার রিডারকে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রাখে। রাজশাহীতেও বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি ভালো ছিল।
নর্দার্ন ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) প্রধান প্রকৌশলী জিয়াউল ইসলাম জানান, রাজশাহী বিভাগে চাহিদামতো ৪৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের পুরোটাই পাওয়া গেছে। তাই কোনো লোডশেডিং ছিল না। এর মধ্যে রাজশাহী শহরের চাহিদা ১১৮ মেগাওয়াটের পুরোটাই সরবরাহ করা হয়েছে।
একইভাবে দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ বুধবার সন্ধ্যা থেকে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ একটু বাড়ায় এই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পেট্রোবাংলা এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৯৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে।
তবে সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ভোগান্তিতে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা গত ১ আগস্ট আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেন এবং ১১ আগস্ট নবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর চালান।
গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যে লোডশেডিংয়ের কষ্ট সহ্য করছিল, ঢাকায় লোডশেডিং শুরুর মাধ্যমে সেই কষ্টের খানিকটা ভাগ এখন রাজধানীর ওপরও এসে পড়ল।
(এই প্রতিবেদন তৈরিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।)


