কিছু সিনেমা সময়কে ছাপিয়ে যায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ‘ঘুড্ডি’ সেই ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকীর পরিচালনায় সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮০ সালের ১৯ ডিসেম্বর। শুক্রবার পূর্ণ হচ্ছে তার ৪৫ বছর।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এলেও দর্শকের কাছে এই ছবির আবেদন কমেনি, বরং আরও দৃঢ় হয়েছে।
আশির দশকের গোড়ায় বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমা অতিরঞ্জন আর ফর্মুলা গল্পে থমকে ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ‘ঘুড্ডি’ ছিল এক ঝলক তাজা হাওয়া।
সিনেমার শুরুতেই দেখা মেলে এক চঞ্চল, নাগরিক তরুণী ঘুড্ডি (সুবর্ণা মুস্তাফা) এবং বেকার যুবক আসাদের (রাইসুল ইসলাম আসাদ) পরিচয় দৃশ্যের। আর এই পরিচয়ের হাত ধরেই দেখা মেলে অন্যরকম এক ঢাকার। যেখানে প্রেম মানে শুধু গান নয়। বরং প্রেম মানে জীবনের টানাপোড়েন, বন্ধুত্বের জটিলতা কিংবা নতুন করে ভাবার সাহস।
এই ছবির কথা উঠলে সবার আগে মনে আসে তার সংগীত। লাকী আখন্দের সুর, হ্যাপী আখন্দের কণ্ঠে ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ বাদ দিলে আধুনিক বাংলা গানই অপূর্ণ রয়ে যায়। ব্লুজ, জ্যাজ আর বাংলা সুরের অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি করেছিলেন লাকী। ‘কে বাঁশি বাজায় রে’ কিংবা ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ শুধু সিনেমার গান নয়—প্রজন্মের অনুভূতি।
মন্টাজে গান ব্যবহারের কৌশল তখনকার সিনেমার জন্য ছিল অভূতপূর্ব।
জাকী চেয়েছিলেন সরল জীবনের গল্প বলতে। সীমিত বাজেট, সীমিত আলো–ছায়া, কিন্তু বাস্তবের মতো অভিনয়। সুবর্ণা আর আসাদের রসায়ন এতটাই স্বাভাবিক ছিল, অনেক দর্শক ভেবেছিলেন তারা যেন সত্যিকারের সম্পর্কের সাক্ষী।
জাকীর সিনেমাটোগ্রাফির পাঠ ছিল গভীর। তাই আলোর ব্যবহার, ফ্রেম নির্বাচন, সবখানেই পাশ্চাত্যের কৌশল আর দেশীয় রূপের মিলন ঘটেছে। ঢাকার ক্যাফে, রাস্তা, মেলা; আজ সেসব দৃশ্য দেখা মানেই এক নাগরিক ইতিহাসের আর্কাইভ।
মুক্তির আগে সেন্সর বোর্ড দ্বিধায় ছিল; এ ধরনের ছবি বাণিজ্যিকভাবে টিকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল। কিন্তু মুক্তির পর সব শঙ্কা উড়ে যায়। ‘ঘুড্ডি’ হয়ে ওঠে এক কাল্ট ক্লাসিক।
চরিত্রের আসাদ ছিলেন যুদ্ধফেরত যুবক, যিনি নিজের অস্তিত্বের সংকটে ভুগছিলেন। যুদ্ধোত্তর অস্থিরতা জাকী ফুটিয়ে তুলেছিলেন সূক্ষ্মভাবে। আর ঘুড্ডি স্বাধীনচেতা নারী, আধুনিক পোশাক পরেন, সিগারেট হাতে আড্ডা দেন, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। সমাজের চোখে তিনি বিদ্রোহের প্রতীক।
ঢাকার তরুণদের স্টাইল, ভাষা, আড্ডার ধারণা—‘ঘুড্ডি’ মুক্তির পর সব বদলে গিয়েছিল। এটা কেবল প্রেমের ছবি নয়, এটা ছিল একাত্তর-পরবর্তী স্বপ্নভঙ্গ, নিঃসঙ্গতা আর টিকে থাকার শিল্পিত দলিল।
‘ঘুড্ডি’ ১৯৮০ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক (সাদা কালো) ও ‘শ্রেষ্ঠ সংলাপ’—এ দুই ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে নেয়।
আজ যে আরবান ড্রামা ঘরানা দেখা যায় ওটিটিতে বা সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রে, তার ভিত রচিত হয়েছিল ‘ঘুড্ডি’তে। সংলাপের সহজ প্রবাহ, যেমন ‘ঘুড্ডি, তোর লাটাইটা আমার হাতে দিস’। অথবা সম্পর্কের সততা আর বিষাদময় সমাপ্তি এই ছবিকে চিরন্তন করে দিয়েছে।
সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী নেই, লাকী-হ্যাপী আখন্দও চলে গেছেন। তবু তাদের তৈরি ‘ঘুড্ডি’ রয়ে গেছে।
৪৫ বছর পর কোনো ক্যাফেতে, কোনো নীরব সন্ধ্যায় যখন ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ বেজে ওঠে; তখন মনে হয় ঘুড্ডির সুতো ছিঁড়ে যায়নি। তা এখনও সময় পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশে।


