শিশু, কিশোরী, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের পুষ্টি উন্নয়নে ধর্মীয় নেতাদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইউনিসেফ। ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর করাই হবে এ লক্ষ্য।
এ নিয়ে মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে একটি অ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইউনিসেফ যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। এতে শিশু, কিশোরী, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের পুষ্টির পাশাপাশি শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী বলেন, ধর্মীয় নেতারা সমাজের মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য। তারা শুধু ধর্মীয় বিষয়েই নয়, মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করাকে মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম আরও জোরদার করতে আগ্রহী ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী বলেন, শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, মায়ের সুস্বাস্থ্য ও কিশোরীদের পুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে আরও সক্ষম ও মানবিক করে গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটির সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সভায় বক্তারা বলেন, সুস্থ মা ও শিশু একটি সুস্থ, দক্ষ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রারম্ভিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও কমিউনিটিকেও সম্পৃক্ত করা জরুরি।
তারা বলেন, মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ইমাম, খতিব, আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় নেতারা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। জুমার খুতবা, ওয়াজ-মাহফিল, ধর্মীয় শিক্ষা, পারিবারিক পরামর্শ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তারা পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পরিচর্যা ও শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ বিষয়ে সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
সভায় জানানো হয়, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে মা ও শিশুকে নিয়মিত স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার পাশাপাশি ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) তথ্য তুলে ধরে সভায় বলা হয়, দেশে বিশেষ করে গর্ভবতী ও প্রসূতি মা, কিশোরী এবং শূন্য থেকে তিন বছর বয়সী শিশুদের পুষ্টিঘাটতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। পরিবার ও কমিউনিটি পর্যায়ে মা ও শিশুর পুষ্টি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ও তথ্যেরও ঘাটতি রয়েছে। প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কারও অনেক ক্ষেত্রে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
সভায় পাঁচটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো হলো গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের পুষ্টি এবং মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্টেশন (এমএমএস), শূন্য থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুর পুষ্টি, কিশোরীদের পুষ্টি, শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ এবং শিশুদের অতিপুষ্টি বা স্থূলতা প্রতিরোধ।
এসব বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নেওয়া হয়। তাদের মতামতের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য, গ্রহণযোগ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য-উপকরণ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে কমিউনিটির শক্তিশালী সেতুবন্ধ তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে ইমাম ও খতিবদের মাধ্যমে মসজিদভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হলে পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর পরিচর্যা, কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ নিয়ে পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়বে।
ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে মা ও শিশুর পুষ্টি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা এবং সঠিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি আচরণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব বলেও সভায় মত দেওয়া হয়। এ জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইউনিসেফের সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


