সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাজারে গিয়ে মগবাজারের মীরবাগের বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম মাহিদের আক্কেলগুড়ুম দশা। আশপাশের কোনো দোকানে সয়াবিন তেলের বোতল নেই। পরে কিলোমিটার তিনেক দূরে গিয়ে দক্ষিণ বনশ্রীর একটি দোকানে পেলেন বোতল, তাতে লিটারে ১০ টাকা করে বেশি দিতে হলো।
এটি যে কোনো বিশেষ এলাকার সমস্যা নয়, সেটি বোঝা গেল মধ্য বাড্ডার এগারো সরণির বাসিন্দা এ এস এম রেজার কথায়। তিনি তেল কিনেছেন তিন দোকান ঘুরে। তিনি বলেন, ‘দুই লিটারের বোতল নেই বাজারে। একটি দোকানে কেবল পাঁচ লিটারের একটি, আর এক লিটারের দুটি বোতল পেয়েছি। আমি সেই দুটি বোতল নিয়েছি।’
তিনি জানান, গত বুধবার থেকেই দোকানগুলোতে এমন সংকট দেখেছেন তিনি। দোকানিরা তাকে বলেছেন, কোম্পানিগুলো তেল দিচ্ছে না।
এটি কি তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টার অংশ–সেই প্রশ্ন উঠেছে এরই মধ্যে। কারণ, গত কয়েক বছরে এভাবেই কোম্পানিগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পর অথবা আগে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়।
এরই মধ্যে ভোজ্যতেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গেছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। এর আগেও দেখা গেছে, সংকট নিয়ে হইচই না হলে মন্ত্রণালয় এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায় না খুব একটা। এবারও একই বিষয় দেখা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বোতলের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে। ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষই জানে, এভাবে অতিরিক্ত দাম আদায়ের সুযোগ নেই। কিন্তু তেল যেখানে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে ক্রেতারা প্রতিবাদও করতে পারছেন না।
মীরবাগের মাহিদ বনশ্রী থেকে তেল কেনার পর টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সকালে বের হয়ে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে কোথাও তেল পাইনি। পরে যে দোকানে পেলাম, তার দোকানি বলছেন তারা বেশি দামে কিনেছেন। ভোক্তা হিসেবে আমাদেরই এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।’
শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, রামপুরা, বসুন্ধরা, মেরুল বাড্ডা ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।
দরকার ২০০ লিটার, পাননি ১০০ লিটারও
ঢাকার প্রধান বাজারগুলোর একটি কারওয়ানবাজার। সেখানে সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এই বাজারের কিচেন মার্কেটের দোকানি সুমন হোসেন বলেন, তার দোকানে সপ্তাহে ২০০ লিটার তেলের চাহিদা থাকলেও এই সপ্তাহে ১০০ লিটারও পাননি।
‘বেশি দাম দিতে চাইলেও বোতলে সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না,’ কয়েক মাস পর পর একই রকমের ঘটনার চক্র দেখে বিরক্ত এই বিক্রেতা।
মেরুল বাড্ডার জামান স্টোরের ব্যবসায়ী জামান মিয়া বলেন, ‘ক্রেতারা প্রতিদিন খুঁজছেন, কিন্তু দেওয়ার মতো বোতল নেই। আমরা যতটুকু অর্ডার দিচ্ছি, তার পুরোটা পাচ্ছি না।’
এটি যে দাম বাড়ার ইঙ্গিত, দীর্ঘ ব্যবসা জীবনে এরই মধ্যে বুঝে গেছেন তিনি। বলেন, ‘আমার ধারণা, আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকার এখনো অনুমোদন দিচ্ছে না, এ কারণে হয়ত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ আসছে না।’
মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার গৃহিণী বিথী আকতার জানান, গত বুধবার সয়াবিন তেল না পেয়ে তিনি পাম তেল কিনে বিপাকে পড়েছেন।
‘রান্নার পর দেখি উপরে তেল ভেসে থাকে। বাসার কেউ সেই তরকারি খেতে পারেনি। সয়াবিন তেল না থাকলে আমাদের খুব ভোগান্তি হয়।’
ফার্মগেটের পূর্ব রাজাবাজার এলাকার কয়েকটি খুচরা দোকানে কেবল আধা লিটারের কয়েকটি বোতল চোখে পড়েছে। দোকানিরা জানান, ছোট বোতলের কিছু সরবরাহ এলেও বড় বোতল কয়েকদিন ধরেই আসছে না। স্বপ্ন ও আগোরার মতো সুপারশপগুলোতে ৫ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে ভালোই। তবে এক বা দুই লিটারের বোতল চোখে পড়ছে না।
দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দরবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন ও জাহাজ ভাড়া বাড়ার কারণ দেখিয়ে গত ২ আগস্ট সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় ভোজ্যতেল উৎপাদন ও
পরিশোধনকারীদের সমিতি বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। তারা বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়ে গত ১১ জুলাই থেকে কার্যকরের প্রস্তাব জানায়।
তবে পাঁচ দিনেও মন্ত্রণালয় কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন প্রস্তাবিত মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের সামঞ্জস্য যাচাই-বাছাই করছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
বাজারে এত বড় সংকট, ভোক্তারা তেল পাচ্ছেন না, অথচ মন্ত্রণালয়ের কোনো তৎপরতা নেই। ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের বাণিজ্য নীতি বিভাগের উপপ্রধান মো. মাহমুদুল হাসান টাইমসের প্রশ্নে বলেন, ‘আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো তথ্য পাইনি। তাই বলা যাচ্ছে না, কবে বাজারে প্রস্তাবিত দামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক দাম সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ করা হবে।’
আগেও ঘটেছে একই ঘটনা
সবশেষ গত ২৯ এপ্রিল বোতলজাত সয়াবিনের দাম ৪ টাকা বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ৫ লিটারের বোতল ৯৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ১৭৬ থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়। সে সময় ব্যবসায়ীরা লিটার প্রতি ১০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করে।
এর আগে দাম বাড়ানো হয় ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর। তখন লিটারপ্রতি ৬ টাকা দাম বাড়ানোয় সায় দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কোম্পানিগুলো এর আগে ১০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে বাজারে সরবরাহ সীমিত করে দেয়।
টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশনস) শফিউল আথার তাসলিম টাইমসকে বলেন, ‘বাজারে ভোজ্যতেলের বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি, বরং গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে মূল্য সমন্বয় না হওয়ার ফল।’
তার ভাষ্য, অক্টোবর থেকে তারা প্রতি মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে মূল্য সমন্বয়ের আবেদন জানিয়ে আসছেন। মাঝখানে একবার আংশিক সমন্বয় হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
তবে অক্টোবরের পর দুইবার মূল্য সমন্বয় হয়েছে। দুইবারই তারা একই ধরনের কথা বলেছেন। বেশি করে দাম না বাড়ালে লোকসান হয়ে যাবে, দাবি করলেও পরে সরকার দুই দফায় ১০ টাকা দাম বাড়ানোর পর বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
কেন প্রতিবার এমন নাটক করতে হয়- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভোক্তারা শুধু সামনের অংশটা দেখেন, কিন্তু এর পেছনে যে বড় গল্প আছে, সেটা অনেকেই জানেন না।’
ভোক্তা অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানও টাইমসকে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের বাজারে দাম বাড়ানোর দাবিতে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। বাজারে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা সরবরাহ সীমিত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং পরে সেই সংকটকে সামনে রেখে সরকারকে দাম বাড়াতে চাপ দেয়।’
সরকারই বা কেন সংকট ঘনীভূত হওয়ার আগে সিদ্ধান্ত নেয় না? এই প্রশ্নে সাবেক এই সচিব বলেন, ‘আসলে চিঠি দিলেই তো হয় না। সব কিছু মিলিয়ে দেখতে হয়। এ জন্য সময় লাগে।’
বাজারে নেই স্বস্তি
চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যার পর বেড়ে যাওয়া সবজির দাম কিছুটা কমেছে। তবে এর মধ্যে নতুন করে মুরগির দাম বেড়ে গেছে। মালিবাগ ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং হাইব্রিড সোনালি ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে এই দুই বাজারে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্রয়লারের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নেই।
ফার্মের মুরগির ডিমের দাম আরও বেড়ে ডজন ১৫০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মাছে ঝুঁকলেও স্বস্তি নেই। বেশিরভাগ চাষের মাছেও কেজি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।
মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তদার মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দাম দিন দিন বাড়ছে। বেশি দামে কেনায় আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। পুঁজিও বেশি লাগছে।’
স্বল্প আয়ের মানুষদের বহু বছরের ভরসা পাঙাশের কেজি ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা ছুঁয়েছে। মাঝারি রুই ৩০০-৩৫০ টাকা, বড় রুই ৪৫০-৫০০ টাকা, কাতলা ৫০০-৫৫০ টাকা, চিংড়ি প্রকারভেদে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা ৯০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
আমদানিতে ঝাঁজ কমেছে কাঁচা মরিচের
ভারত থেকে আমদানির পর এক সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। ৪০০ টাকায় উঠে যাওয়া রান্নার এই উপকরণ কোথাও কোথায় ২০০ টাকার নিচেও পাওয়া যাচ্ছে।
রামপুরা বাজারের সবজি বিক্রেতা রামিম তালুকদার জানালেন, টানা বৃষ্টি থামায় সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে বেগুন, করলা, ঝিঙা, গাজর, কচুর লতি, সবই একশ থেকে ১৪০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
রামপুরা বাজারে আসা সরকারি চাকরিজীবী মাহমুদ আলম বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় আজ সবজির দাম কিছুটা কম মনে হচ্ছে। তবে যথেষ্ট কমেনি।’


