২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এইচএসসি) পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার কমে গেছে। এর মধ্যে ছাত্র ও ছাত্রীদের সংখ্যার ব্যবধান চোখে পড়ার মতো। যত পরীক্ষার্থী কমেছে, তার প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই ছাত্র।
পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় গত ২০২৪ সালের চেয়ে পরীক্ষার্থী কমেছে এক লাখ ৮০ হাজার ২০৭ জন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে ছাত্র ও ছাত্রীদের সংখ্যার মধ্যে একটা বড় অমিল দেখা গেছে। যেখানে ছাত্র পরীক্ষার্থী কমেছে এক লাখ ২৮ হাজার ৩১২ জন, সেখানে ছাত্রী কমেছে ৫১ হাজার ৮৯৫ জন।
আরও চিন্তার বিষয়, দুই বছর আগে যারা এসএসসি পাস করেছিল, তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই এবার এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম ফিলাপ করেনি। দেশের ইতিহাসে কলেজ পর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার এটাই সবচেয়ে বড় রেকর্ড।
শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার যে পুরোনো ধারা দেশে ছিল, তাতে হঠাৎ এমন ধস নামলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এর কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত করেনি। অথচ এই নেতিবাচক ধারাটি শুরু হয়েছিল ২০২৪ সাল থেকেই। ওই বছর জুন মাসে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৭৯০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় বসা শুরু করার পর জুলাই মাসে দেশজুড়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়, যার জেরে ৫ আগস্ট সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনের কারণে তখন বাকি পরীক্ষাগুলো বাতিল করে আগের ফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রেজাল্ট দেওয়া হয়েছিল।
এরপরের মাসগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে অস্থিরতা চলে, তা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মনমানসিকতা একদম নষ্ট করে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আন্দোলনের কারণে তরুণদের মনে যে গভীর মানসিক আঘাত তৈরি হয়েছিল, রাষ্ট্র তাদের সেই আঘাত কাটিয়ে তুলতে বা পুনর্বাসন করতে পারেনি।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি দ্রুত পড়াশোনার ভালো পরিবেশ ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এর বড় খেসারত দিতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবুল কালাম আজাদ মনে করেন, অনেক শিক্ষার্থী হয়তো পুরোপুরি পড়াশোনা ছেড়ে দেয়নি। কেউ হয়তো কাজে ঢুকে পড়েছে, কেউ পড়ার বিভাগ বদলেছে, আবার কেউ হয়তো প্রস্তুতির অভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে না। তবে এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকার এই ঘটনা একেবারেই নজিরবিহীন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরের অধ্যায়
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় যে শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে, তারা মূলত ২০১৪ সালে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১২ বছর আগে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া ৪১ লাখ ৭০ হাজার শিশুর মধ্যে ১০ লাখের বেশি শিশু ২০১৮ সালের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণীতে ওঠার আগেই স্কুল ছেড়ে দেয়। ২০২৪ সালের মধ্যে এই ব্যাচ থেকে মাত্র ২০ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দেয় এবং পাস করে ১৬ লাখ ৭০ হাজার।
আর এখন, অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মিলিয়েও কেবল নয় লাখ ৫০ হাজার পরীক্ষার্থী ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। এর মানে দাঁড়ায়, প্রথম শ্রেণীতে একসঙ্গে শুরু করা মূল ব্যাচের প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে হারিয়ে গেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার এই হার অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। তুলনা করে দেখলে, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সব মিলিয়ে ঝরে পড়ার হার ২০২৪ সালে ছিল ৬১ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয় ৬৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ২০২০ সালে করোনার কারণে পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছিল এবং ২০২২ সালে ঝরে পড়ার হার কিছুটা বেড়েছিল। তবে ২০২৩ সালের মধ্যে তা আবার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাকে পুরোপুরি ভেস্তে দিয়েছে, ২০২৬ সালে ঝরে পড়ার হারকে এক নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক চাপ কি শিক্ষাবিমুখ করছে শিক্ষার্থীদের?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শিক্ষা খাতের ওপর বড় আঘাত হেনেছে। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে আকাশছোঁয়া হয়েছে, তাতে কম আয়ের পরিবারগুলো সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পেছনে খরচ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এমনকি যেখানে খরচ চালানো সম্ভব, সেখানেও অনেক বাবা-মা বাধ্য হয়ে সন্তানদের পড়াশোনা থামিয়ে অকালেই কাজে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত ইউনিসেফের একটি গবেষণা রিপোর্টেও এর প্রমাণ মিলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ ছেড়ে দেওয়ার পেছনে প্রায় ৬৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী দারিদ্র্য।
এই তথ্যটি দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্যের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত জানুয়ারির একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে একলাফে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়ে গেছে।
এই সংকটকে আরও বড় করে তুলেছে ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচশ’রও বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই খাতটি এখনো ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি বা বাজারের দামের তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গরিব পরিবারগুলোর ওপর।
গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান টাইমস’কে বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই শিশুরা পরিবারের হাল ধরতে কাজে নামতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক বাবা-মা মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। ইউএনএফপিএ-এর তথ্য দিয়ে তিনি জানান, দেশে এখনো ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর হওয়ার আগেই হয়ে যায়। এছাড়া মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলেন, ইদানীং শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে ছেলেদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি একধরনের অনীহা তৈরি হচ্ছে। তারা পড়াশোনা বা কোনো কিছুর প্রতিই আগ্রহ না পেয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা গত কয়েক বছর ধরে বেশ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃঙ্খলতায় বাড়ছে সংকট
জুলাইয়ের আন্দোলনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘মব’ বা দলবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণে ক্যাম্পাসগুলো পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ টাইমসের কাছে শিক্ষার্থীদের আচরণের এই বড় পরিবর্তনের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘অনেক অনুরোধ করেও শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো যাচ্ছিল না। অন্যদিকে শিক্ষকরা সবসময় হেনস্থা হওয়ার আতঙ্কে থাকেন। শিক্ষকরা এখন শুধু কোনোমতে নিজেদের ডিউটি শেষ করে নিরাপদে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যেতে চান।’
শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, এই বিশৃঙ্খলার পেছনে রয়েছে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব বা কর্তৃত্বের এক বড় সংকট, যার মূল রয়েছে অতীতের রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে। তিনি বলেন, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে অনেক শিক্ষক পোলিং অফিসার হিসেবে কাজ করেছিলেন, যে কারণে শিক্ষার্থীরা এখন তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাছাড়া, রাজপথের আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের একটি অংশ পড়াশোনায় মন দেওয়ার বদলে ক্যাম্পাস রাজনীতি এবং অন্যান্য নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. আজহারুল ইসলাম জানান, ২৫০ জন মানুষের ওপর করা একটি জরিপে দেখা গেছে, জুলাইয়ের আন্দোলন সব বয়সের মানুষের মনেই গভীর মানসিক ক্ষত বা ট্রমা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, শুধু দু’একজনকে থেরাপি দিয়ে এই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা দূর করা সম্ভব নয়।
অধ্যাপক আজহারুল টাইমসকে বলেন, ‘এই বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে জাতীয় পর্যায়ে একটি বড় ধরনের সামাজিক সমঝোতা ও মেলবন্ধন দরকার।’ তিনি সতর্ক করে দেন, সমাজের ভেতরের বিভেদ ও একে অপরকে সহ্য করতে না পারার মানসিকতা শিক্ষার্থীদের জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটি ঠিক করতে হলে রাষ্ট্রকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে মানুষ পরমতসহিষ্ণু হবে। তরুণ প্রজন্ম শিখবে কিভাবে ভিন্ন মত বা রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও সবাই একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করা যায়।


