তেহরানের নির্দেশিত পথে না চলায় একটি জাহাজে গুলি চালানোর পর হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। স্থানীয় সময় শনিবার প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে তারা জানায়, এ ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে কোনো পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরান সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালানোর পর দেশটির ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে বাহরাইন, কাতারসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)।
বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হরমুজ প্রণালি ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত’ বন্ধ থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের এই অভিজাত বাহিনী।
তেহরান জানিয়েছে, অনুমোদনহীন পথে চলা একটি জাহাজকে সতর্ক করতে গুলি ছোড়া হয়। তবে সতর্ক করার পরও তারা গতিপথ পরিবর্তন করেনি। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দফায় ছোড়া গুলিতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপরই তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যকর অবরোধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হামলার শিকার জাহাজটির নাম এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি। সাইপ্রাসের পতাকাবাহী এই কনটেইনার জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে এবং একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা কেন্দ্র জানিয়েছে, ওমানের পূর্ব উপকূলে ক্ষতিগ্রস্ত একটি কনটেইনার জাহাজের নাবিকরা জাহাজ ছেড়ে লাইফবোটে আশ্রয় নিয়েছেন।
যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির কয়েকটি বন্দরনগরীতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
এর কিছুক্ষণ পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে সামরিক কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং ড্রোন রাখার স্থাপনা ধ্বংস করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। কাতারও ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি করেছে। বাহরাইনে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, তারা শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় রাত ১১টা ১৫ মিনিট) হামলা শুরু করে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর এ হামলা চালানো হয়।
সেন্টকমের কর্মকর্তারা জানান, ইরানের হুঁশিয়ারি তোয়াক্কা না করেই হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানকে প্রকাশ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা বন্ধ করার ঘোষণা দিতে হবে এবং কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই সব নৌপথ উন্মুক্ত রাখবে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে এই দাবি মানতে অস্বীকার করেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘পারস্পরিক দাবি মেনে চলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কেবল একপাক্ষিক দাবি আর মানা হবে না।’
এর আগে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির অনুমোদন বাতিল করে। তার আগে সপ্তাহের শুরুতে কাতার ও সৌদি আরবের তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকার হামলার শিকার হয়, যার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
যদিও ওই জাহাজগুলোতে হামলার দায় ইরান স্বীকার করেনি, তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান আলোচনায় প্রভাব বাড়াতে এ ধরনের পদক্ষেপ ব্যবহার করছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও পাকিস্তান শনিবার একটি আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছিল। মধ্যস্থতাকারীরা এ বৈঠকের আয়োজনের চেষ্টা করছিলেন। ওই সময় আরাগচি যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতাকারী উপসাগরীয় দেশ ওমানে অবস্থান করছিলেন।
তবে ওই আলোচনা সফল হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি ওমানে বৈঠকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপযুক্ত পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় করা হয় বলে এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে তেহরান।
ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ওমান ও ইরানের আলোচকরা প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাবেন।
সিএনএন শনিবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। এতে ওমানের জলসীমার দক্ষিণ করিডোর দিয়ে অবাধ নৌ চলাচলের কথা বলা হয়েছে।
খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে উত্তর করিডোর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে আগে থেকে ইরানের অনুমোদন নিতে হবে। তবে কোনো ধরনের শুল্ক আরোপ করা হবে না।
সিএনএনের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির লিখিত এক বিবৃতিতে শনিবার তার পূর্বসূরি ও বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের জন্য যা-ই ঘটুক না কেন, এই প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শহীদ নেতার রক্ত এবং সব শহীদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করছি।’
গত বৃহস্পতিবার ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে এ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। তবে তার ছেলে মোজতবা খামেনি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।


