হাজার কোটি টাকা খরচ করেও জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলছে না রাজধানী ঢাকার। গত এক যুগে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কমপক্ষে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও বর্ষা কিংবা ভারী বৃষ্টি হলেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। শহরের বিভিন্ন সড়ক ও এলাকা তলিয়ে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েন লাখো মানুষ।
দুই সিটি করপোরেশনের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল থাকলেও সমন্বয়হীন পরিকল্পনা ও বিক্ষিপ্ত কার্যক্রমের কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ব্যয় করেছে অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিএসসিসির খরচ প্রায় ৩৬০ কোটি এবং ডিএনসিসির প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা ও নগর ব্যবস্থাপনায় চলমান সংকটের মূল কারণ হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা, ২৫ থেকে ৩০ বছরের পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আউটলেটের অভাব, নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার এবং সমন্বিত মাস্টার প্ল্যানের অনুপস্থিতি।
তিনি বলেন, ড্রেন ও খাল সিটি করপোরেশনের আওতায় আসার পর থেকে এখনো পর্যন্ত একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান তৈরি বা হালনাগাদ করা হয়নি। সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
এসব কাঠামোগত সমস্যার কারণে সিটি করপোরেশনের একাধিক প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিপুল ব্যয়, নেই হিসাবের স্বচ্ছতা
সিটি করপোরেশনের উদ্যোগগুলোর আর্থিক দিক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিপুল ব্যয় হলেও তার সমন্বিত সুফল মিলছে না। ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার টাইমসকে জানান, রুটিন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ড্রেন ও খাল পরিষ্কারসহ রক্ষণাবেক্ষণে তাদের প্রতি বছর প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
সম্প্রতি ধানমন্ডি লেক সংলগ্ন রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে ডিএসসিসির এক গণশুনানিতে যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩৫০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, নিউমার্কেট, গাউছিয়া ও ধানমন্ডি এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ধানমন্ডি এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য বিডিআর এলাকার পাশ দিয়ে আদি বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত একটি আউটলেট তৈরি করা হবে।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরের কাছে চলতি বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে মোট ব্যয়ের হিসাব জানতে চাওয়া হলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ জানাতে পারেননি।
তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশল বিভাগসহ একাধিক বিভাগ সম্পৃক্ত থাকায় সব বিভাগের ব্যয় সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত মোট খরচ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
১০৯ বর্গকিলোমিটারের পানি নিষ্কাশনে ৩ আউটলেট
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১০৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশনের মূল সংকট হলো আউটলেট বা নির্গমন পথের অভাব। বর্তমানে ধোলাইখাল, কমলাপুর-টিটিপাড়া এলাকা এবং পান্থপথ বক্স কালভার্ট হয়ে হাতিরঝিল—এই তিনটি পথেই পুরো দক্ষিণের পানি নিষ্কাশিত হয়।
ডিএসসিসির কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, এই বিশাল এলাকার জন্য অন্তত ৮ থেকে ৯টি আউটলেট প্রয়োজন। তা ছাড়া বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা ২৫-৩০ বছরের আগের এবং অপরিকল্পিত। নতুন আউটলেট স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বর্তমানে ‘ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’ (আইডব্লিউএম) কাজ করছে।
আউটলেটের অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই শুক্রাবাদ, ধানমন্ডি ২৭-এর মতো এলাকায় চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। পশ্চিম রাজাবাজার, সোবহানবাগ বা সংসদ ভবন এলাকার মতো উঁচু স্থান থেকে পানি ঢাল বেয়ে শুক্রাবাদে নামে, এমনকি ম্যানহোল দিয়েও পানি উল্টো উঠে আসে। বাধ্য হয়ে রিকশায় স্বাভাবিক ২০ টাকার ভাড়া ৫০-১০০ টাকা গুনতে হয় যাত্রীদের। রাতে খোলা ম্যানহোল ও গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হন সাধারণ মানুষ।
৩৩ হটস্পট ঘিরে দুই সিটির তৎপরতা
বর্ষা মোকাবিলায় দুই সিটি করপোরেশনই কুইক রেসপন্স টিম মাঠে নামিয়েছে। ডিএনসিসি ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল হটস্পট নির্ধারণ করেছে। সংস্থাটি ১০টি অঞ্চলের জন্য ৩৬০ জন কর্মীর ২০টি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছে।
ধানমন্ডি ২৭, মিরপুর-১ দারুস সালাম রোড, প্যারিস রোড, এবং বেগম রোকেয়া সরণি সংলগ্ন কাজীপাড়া (বগার মা খাল পর্যন্ত), কালশী, নাখালপাড়া এবং উত্তরা সেক্টর-৪ থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিভিন্ন ড্রেনেজ ও বক্স কালভার্ট সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে, ডিএসসিসি ৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধানমন্ডি ২৭ (রাপা প্লাজা), গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ঢাকা কলেজের পেছনের নায়েম গলি, মালিবাগ ১ম লেন, শান্তিনগর, খিলগাঁও, পল্টন, শাপলা চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোকাররম ভবন এলাকা, পলাশী, মুগদা মেডিকেল, মানিকনগর টিটিপাড়া এবং পুরান ঢাকার আগাসাদেক রোড, মাজেদ সরদার রোড, জুরাইন ও চানমারী মোড় ইত্যাদি।
ডিএসসিসি প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০ সদস্যের বিশেষ টিম গঠন করেছে এবং পানি সেচের জন্য ৬টি পুরোনো পাম্পের সঙ্গে ৪টি নতুন পাম্প যুক্ত করে মোট ১০টি পোর্টেবল পাম্প প্রস্তুত রেখেছে।
এ ছাড়া, ডিএসসিসি প্রশাসকের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমি থেকে টিটিপাড়া পাম্প স্টেশন পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের কাজ চলছে। তিনি জানান, অঞ্চল ১ থেকে ৫ পর্যন্ত একটি আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর অংশ হিসেবে মান্ডা, জিরানী, শ্যামপুর ও কালুনগর খালের উন্নয়ন প্রকল্পের ২০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
ডিএনসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন ওয়ার্ডে নতুন ক্যাচপিট, পাইপ নর্দমা, বক্স কালভার্ট ও মাস্টার ড্রেনেজ লাইনের কাজ চলমান রয়েছে, যার কিছু ইতোমধ্যে সচল হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব উদ্যোগের কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না।
দিনের বেলায় কোনোমতে চলাচল করা গেলেও, রাতে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। খোলা ম্যানহোল বা রাস্তার গর্তে পড়ে আহত হন সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে রিকশা ও সিএনজি চালকরা।

ঢাকার মেরুল বাড্ডার ভাতের হোটেলের কর্মী মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘রাত ১০টা-১১টার দিকে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে খাবারের ডেকচি নিয়ে যেতে হয়। রাস্তায় কোথায় ভাঙা আর কোথায় অক্ষত, পানির নিচে তা বোঝাই যায় না। একদিন গর্তে পড়ে গিয়ে আমার সব খাবার পড়ে যায়। রাতে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করাটা আরও কঠিন।’
সূত্রাপুরের বাসিন্দা মুবাশশির আলম বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির গেট দিয়ে পানি ঢুকে নিচতলা ডুবে যায়। ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে এবং আমাদের অফিসে যাতায়াত অসহনীয় হয়ে ওঠে। আসবাবপত্র নষ্ট হয়, দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। ভাসমান ময়লা থেকে যে দুর্গন্ধ ছড়ায়, তা টেকার মতো নয়। পানি বেশি থাকলে রিকশায় উঠলেও কাপড় ভিজে যায়।’
জলাবদ্ধতার এই সময়ে রিকশাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। আর এই সুযোগে ২০ টাকার স্বাভাবিক ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ থেকে ১০০ টাকায়। বাড়তি খরচ বাঁচাতে অনেকেই বাধ্য হয়ে নোংরা পানির মধ্যেই হাঁটেন।
জলাবদ্ধতার নীরব ঘাতক পলিথিন
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পলিথিন। ২০০৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, একমাত্র পলিথিনই নগরীর ভূগর্ভস্থ পয়ঃনিষ্কাশন পাইপ বন্ধ করে দিচ্ছে। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ২০ মাইক্রনের কম পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও এর যথেচ্ছ ব্যবহার চলছে। কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর সর্বত্রই ড্রেনে পলিথিন ফেলার চিত্র অভিন্ন।
ডিএনসিসি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ২২২ কিলোমিটার স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন এবং দেড় কিলোমিটার বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করেছে। আধুনিক ‘জেট অ্যান্ড সাকার’ মেশিন দিয়ে কাটাসুর, মহাখালী, কালশী ও রূপনগর খাল থেকে বিপুল পলিথিন অপসারণ করা হয়েছে।

গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি মিলিয়ে ‘ব্লু-নেটওয়ার্ক’ নামের মোট ১৯টি খালের সংস্কার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। প্রথম ধাপে ৬টি খাল সংস্কারের কথা থাকলেও বেশিরভাগ খালেই দেখা যায় পলিথিনের স্তূপ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন চারটি খাল বাউনিয়া, কড়াইল, রূপনগর ও বেগুনবাড়ি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন মান্ডা ও কালুনগর খালকে জলাবদ্ধতায় পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দেখা গেছে, এসব খালে জমা পলিথিন জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান টাইমসকে বলেন, ‘ঢাকায় এক ঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিতেই মিরপুর, যাত্রাবাড়ী কিংবা মোহাম্মদপুর কোমর পানির নিচে চলে যায়। আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, অভিযানও চলে। কিন্তু সিটি করপোরেশন, মনিটরিং সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। ফলে নিষিদ্ধ পলিথিন প্রকাশ্যেই বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘শুধু ড্রেন পরিষ্কারে বিপুল জনবল নামিয়ে সমাধান হবে না। উৎসেই এর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আর এখানেই আসে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণ: আমরা পলিথিন নিষিদ্ধ করেছি, কিন্তু সাধারণ মানুষের হাতে সহজলভ্য কোনো বিকল্প তুলে দিতে পারিনি।’
কমিউনিটির অংশগ্রহণ না থাকায় উদ্যোগগুলো পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা না যাবে, তারা সচেতন না হবে এবং সমন্বয়হীন খণ্ডিতভাবে কাজ করা হবে, ততক্ষণ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।


