উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং জবাবদিহির দুর্বলতা কমাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের সব উন্নয়ন প্রকল্পে পূর্ণকালীনর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য নিয়মিত সরকারি বেতন কাঠামোর বাইরে অতিরিক্ত ও আকর্ষণীয় বেতন দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রচলিত অনুযায়ী নিয়মিত সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে নতুন ব্যবস্থায় এ প্রচলন বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের প্রবণতা ঠেকাতে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি আলাদা প্রকল্প পরিচালক পুল গঠনেরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি পরিকল্পনা বিভাগে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি একটি আলাদা প্রকল্প পরিচালক পুল গঠনের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের সব প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বৈঠকে এসব প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা বিভাগের সচিবকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান কর্মকর্তারা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে অনেক প্রকল্প পরিচালক নিয়মিত সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্প পরিচালনা করছেন।
তাদের মতে, অনেক প্রকল্পে একই সময়ে একাধিকবার পরিচালক পরিবর্তন করা হয়। এতে কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়, নতুন পরিচালকের জন্য দায়িত্ব বুঝে নিতে সময় লাগে এবং সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হয়। এর ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়- দুটিই বেড়ে যায়।
কর্মকর্তারা জানান, এই সমস্যা সমাধানে বড় প্রকল্পগুলোতে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তারা আরও জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি প্রকল্প পরিচালক পুল তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এসব কর্মকর্তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পভিত্তিক নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামো নির্ধারণের কাজ চলছে, যাতে প্রকল্প নেতৃত্ব আরও আকর্ষণীয় হয়।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, দেশে বর্তমানে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পের দায়িত্ব সব সময় দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়া হচ্ছে না।
‘এর ফলে কাজের মান কমে যায় এবং বাস্তবায়নে অযৌক্তিক বিলম্ব হয়’, যোগ করেন তিনি।
শাকিল বলেন, ‘এ উদ্দেশ্যে একটি প্রকল্প পরিচালক পুল তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুরুতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে এ পুল গঠন করা হবে এবং তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’
‘তবে সততা না থাকলে শুধু প্রশিক্ষণ কোনো কাজে আসবে না। দক্ষতার পাশাপাশি সততাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করেন তিনি।
পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে শাকিল আখতার বলেন, আগে প্রকল্প পরিচালকদের ঘন ঘন বদলির প্রবণতা ছিল। তবে গত এক বছরে এ প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বড় ব্যয়ের প্রকল্পগুলোতে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়ার কথা বলেছেন।
‘আমরা যদি চার-পাঁচ বছরের কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলে প্রকল্পের চালিকাশক্তিকে শক্তিশালী হতে হবে’, বলেন তিনি।
‘এ লক্ষ্যেই প্রচলিত পদায়ন পদ্ধতি থেকে সরে আসার চিন্তা করা হচ্ছে’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তারা যেমন লিয়েন ব্যবস্থায় জাতিসংঘ বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে আকর্ষণীয় বেতন ও ভাতা পান, তেমন ব্যবস্থায় প্রকল্প পরিচালকদের জন্যও আকর্ষণীয় বেতন ও ভাতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, এ ধরনের ব্যবস্থায় কর্মরত কর্মকর্তারা মাসে তিন লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত পান। প্রকল্পের আকার অনুযায়ী প্রচলিত সরকারি বেতন কাঠামোর বাইরে আলাদা আকর্ষণীয় বেতন নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শাকিল আখতার বলেন, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কাঠামোর মধ্য থেকে দক্ষ জনবলকে লিয়েন ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া অবসর নেওয়া অভিজ্ঞ ও সফল সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদেরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হবে।
তিনি জানান, প্রস্তাবগুলো নিয়ে এরইমধ্যে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবরা নীতিগতভাবে এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
সাবেক বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ পদ্ধতিতে সংস্কারের আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক প্রকল্প পরিচালক নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করতে পারছেন না।
অনেক ক্ষেত্রে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হওয়া এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি এমন ব্যবস্থা করা যায় যে একজন প্রকল্প পরিচালক পুরো প্রকল্পের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রকল্প শেষ করবেন, তাহলে এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ হবে।’
প্রস্তাবিত প্রকল্পভিত্তিক বেতন কাঠামোর বিষয়ে প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, আগে প্রকল্পগুলোকে শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে। প্রকল্পের আর্থিক আকার, জনস্বার্থে এর গুরুত্ব, সম্ভাব্য ফলাফল এবং প্রকল্পটি নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি সারা দেশে বাস্তবায়ন হবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং বেতন-ভাতা কাঠামো নির্ধারণ করা উচিত।


