ফুটবলকে বলা হয় শান্তির প্রতীক, যেখানে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে সম্প্রীতি। অথচ কখনো কখনো রাজনীতির মাঠের বৈরিতা এসে কড়া নাড়ে ফুটবল মাঠের দরজায়। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সেই লড়াইয়ের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন ইরানি ফুটবল কিংবদন্তি খোদাদাদ আজিজি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ফুটবলের উচিত সবসময় শান্তি প্রচার করা এবং খেলাকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা।
৫৪ বছর বয়সী আজিজি এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন ইরান যৌথ আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে দুই দেশের মধ্যে চলছে তীব্র যুদ্ধাবস্থা। এর মধ্যে মঙ্গলবার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে টিম মেল্লি ডাকনামের ইরান দলটি। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এবারই প্রথম নকআউট পর্বে পৌঁছানোর বড় আশা করছে তারা। আজিজি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানান, নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পারলে গ্রুপ পর্ব পার হওয়া ইরানের জন্য খুব একটা কঠিন কাজ হবে না।
তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে নামার আগে ইরানি দলটিকে বেশ কিছু বড় বাধা পেরিয়ে আসতে হয়েছে। রাজনীতির টানাপোড়েনে তাদের দলের মূল বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনার টুকসন থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানায় নিয়ে যেতে হয়েছে। এ ছাড়া, ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান মেহেদি তাজসহ প্রতিনিধি দলের ১৫ জন সদস্যকে শুরুতে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
এই বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আজিজি স্মৃতির পাতায় ফিরে যান ১৯৯৮ সালের সেই বিখ্যাত ম্যাচে। সেবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুই এক ব্যবধানে হারিয়েছিল ইরান, আর সেই জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন আজিজি নিজেই। ম্যাচ শুরুর আগে বিশ্বজুড়ে স্মরণীয় হয়ে থাকা এক সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃশ্যে দুই দেশের খেলোয়াড়রা একে অপরকে ফুল উপহার দিয়েছিলেন। সে সময় ইরানের অধিনায়ক ও গোলরক্ষক আহমদরেজা আবেদজাদেহ আমেরিকান দলের হাতে ইরানি হস্তশিল্প তুলে দেন। দুই দেশের সরকারের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ফিফার উদ্যোগে দুই দল একসাথে দাঁড়িয়ে যৌথ গ্রুপ ছবি তুলেছিল, যা আজও ফুটবলের সৌন্দর্যের এক অনন্য উদাহরণ।
ইরানি ধারাভাষ্যকারদের দেওয়া দ্রুতগামী হরিণ ডাকনামের সাবেক এই স্ট্রাইকার জানান, ১৯৯৮ সালের সেই উত্তেজনাকর ম্যাচ চলাকালীন তিনি দুই দলের মধ্যে কোনো ধরনের অশোভন আচরণ লক্ষ্য করেননি। ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর ফিফা দুই দলকেই ফেয়ার প্লে পুরস্কারে ভূষিত করেছিল। আজিজি নিজের একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি মনে করে বলেন, ম্যাচ শেষে তিনি মার্কিন দলের দুই নম্বর জার্সি পরা খেলোয়াড় ফ্রাঙ্কি হেজদুকের সঙ্গে জার্সি বদল করেছিলেন। এই আচরণের মাধ্যমে তারা পুরো বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে ফুটবল সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে।
বর্তমানে ইরানের একজন জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার হিসেবে কর্মরত আজিজি কিছুটা আফসোস করে বলেন, এবারের টুর্নামেন্টের পরিবেশ রাজনীতি ছাড়া আর কিছুতে পূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি দলের প্রবেশের ক্ষেত্রে যে ধরনের কড়াকড়ি করা হচ্ছে, তেমন আচরণ তিনি তার ক্যারিয়ারে আগে কখনো দেখেননি। ১৯৯৮ সালে দলগুলো যে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা পেয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। এই পুরো বিষয়ে ফিফার দুর্বলতার সমালোচনা করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এতসব বিতর্ক আর মাঠের বাইরের মানসিক চাপের মাঝেও একটি স্বস্তির খবর দিয়েছেন আজিজি। ইরান দলের সদস্যরা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে তাকে জানিয়েছেন, তারা মাঠের বাইরের এসব জটিল বিষয় নিয়ে মোটেও ভাবছেন না। খেলোয়াড়দের সম্পূর্ণ মনোযোগ এখন কেবল ফুটবলের ওপর।
ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের কেউ কেউ সমালোচনা করে বলছেন, এই দলের খেলোয়াড়রা জনগণের পরিবর্তে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবে এমন রাজনৈতিক বক্তব্যকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে আজিজি বলেন, একজন ফুটবলার সবসময় তার দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য খেলেন, কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়। সমস্ত রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে ফুটবলাররা যেন কেবল খেলায় মেতে উঠতে পারেন, ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশাও ঠিক সেটাই।


