ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। পশ্চিম জার্মানির মাটিতে অনুষ্ঠিত এই আসরে একদিকে ছিল স্বাগতিকদের চেনা শক্তি, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবধর্মী ফুটবল; অন্যদিকে ইয়োহান ক্রুইফের নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডসের চোখধাঁধানো ‘টোটাল ফুটবল’। শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিতেছিল পশ্চিম জার্মানি, তবে পুরো টুর্নামেন্টের আলো কেড়ে নিয়েছিল ডাচদের খেলার নতুন ধরন।
সেবার ক্রুইফের নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডস বিশ্বকে এমন এক ফুটবল উপহার দেয়, যা ফুটবলপ্রেমীরা আগে কখনো দেখেনি। খেলোয়াড়দের নির্দিষ্ট কোনো পজিশনে আটকে না রেখে পুরো দলকে একসঙ্গে আক্রমণ ও রক্ষণে নামিয়ে দেওয়ার কৌশলই ছিল টোটাল ফুটবলের মূল চালিকাশক্তি। এই অপ্রতিরোধ্য গতিতে ভর করেই ফাইনালে পা রাখে তারা।
ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের শুরুতে ক্রুইফের দুর্দান্ত এক দৌড় থামাতে গিয়ে ফাউল করে বসে জার্মানি। পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ইয়োহান নেসকেন্স। অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, নেদারল্যান্ডস যখন গোলটি করে, তখনও কোনো জার্মান খেলোয়াড় বল ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পাননি। শুরুটা দেখে মনে হয়েছিল, ট্রফি বুঝি ডাচদের ঘরেই যাচ্ছে।
তবে স্বাগতিক জার্মানরা হাল ছেড়ে দেওয়ার দল ছিল না। অধিনায়ক ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার দ্রুত দলকে সংগঠিত করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে পল ব্রাইটনার পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফেরান। এরপর প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গার্ড মুলার করেন জয়সূচক গোলটি। শেষ পর্যন্ত ২ থেকে ১ ব্যবধানে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি।
এই বিশ্বকাপের গল্প অবশ্য শুধু ফাইনালেই আটকে ছিল না। আসরে সাতটি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতেন পোল্যান্ডের গ্রেজগর্জ লাতো, আর তার দল পায় তৃতীয় স্থান। অন্যদিকে স্কটল্যান্ড একটি ম্যাচও না হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অদ্ভুত রেকর্ড। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল পূর্ব জার্মানির কাছে পশ্চিম জার্মানির হার। ইতিহাসে এটি ছিল দুই জার্মানির মধ্যে কোনো বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একমাত্র মুখোমুখি ম্যাচ।
ইতিহাসের পাতায় চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পশ্চিম জার্মানির নাম লেখা থাকলেও ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপকে মানুষ আজও মনে রেখেছে নেদারল্যান্ডসের জন্য। শিরোপা না জিতেও ক্রুইফের দল ফুটবলের চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে। তাই এই বিশ্বকাপের গল্পে যেমন আছে বেকেনবাওয়ার ও মুলারের ট্রফি জয়ের উল্লাস, তেমনি মিশে আছে টোটাল ফুটবলের এক অপূর্ণ অথচ নান্দনিক স্বপ্নের উপাখ্যান।


