বিএনপি সরকার প্রস্তাবিত নতুন ঋণ সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করতে শিগগিরই ঢাকায় আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধি দল। আইএমএফ-এর বিদ্যমান কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে আইএমএফ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার বলেন, সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে আইএমএফ বর্তমানে বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচি ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে।
তবে প্রতিনিধি দলের সফরের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনও জানানো হয়নি।
ইভো ক্রজনার বলেন, এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ), এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএফএফ) এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ)-এর আওতায় চলমান কর্মসূচিগুলো একটি কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সহায়তা হিসেবে কাজ করেছে।
তবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কর্মসূচিটি অনুমোদনের পর থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আইএমএফের মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং নিম্ন রাজস্ব বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় নতুন করে ধারাবাহিক সংস্কার উদ্যোগ প্রয়োজন।
ক্রজনার বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে উত্তরসূরি কর্মসূচির অনুরোধ বর্তমান চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং নতুন সরকারের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার অন্তর্ভুক্ত করে একটি সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’
তিনি জানান, নতুন কোনো কর্মসূচি হলে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) প্রয়োজন, বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কর্মসূচিভিত্তিক শক্তিশালী নীতিগত অঙ্গীকার এবং আইএমএফ নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।
আইএমএফের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিনিধি দল সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং সংস্কার চ্যালেঞ্জ মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ সফর করবে। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় সম্ভাব্য কর্মসূচির আকার, অর্থের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার অঙ্গীকার নিয়ে দরকষাকষি হবে।
ক্রজনার বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অর্থনীতির সহনশীলতা বাড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টায় আইএমএফ বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা করছে আইএমএফ।
এর কয়েকদিন আগে অর্থ মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, আগের সরকারের সময়ে নেওয়া বিদ্যমান আইএমএফ কর্মসূচি থেকে সরে এসে বাংলাদেশ নতুন একটি ঋণ সহায়তা কর্মসূচি চাইবে, যেখানে অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য তিন বছরের সময়সীমা থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্ক-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল বৈঠকে এ নীতিগত পরিবর্তন চূড়ান্ত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, চলমান আইএমএফ কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগের কর্মসূচিটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে নির্ধারিত সংস্কার বাস্তবায়ন জটিল হয়ে পড়ে।
অর্থমন্ত্রী আইএমএফ কর্মকর্তাদের জানান, সরকার সংস্কার কার্যক্রমে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিন বছরে ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত নতুন কর্মসূচির আকার চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বাজেট সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ২০২২ সালের জুলাইয়ে আইএমএফের সহায়তা চেয়েছিল। পরে তিনটি ঋণ সুবিধার আওতায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি অনুমোদিত হয়, যা পরে বেড়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।
এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আলোচনা স্থগিত হয়ে যাওয়ায় বাকি ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের দুই কিস্তি এখনও ছাড় হয়নি।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং রাজস্ব সংস্কার নিয়ে এখনও মতভেদ রয়েছে। তাদের মতে, আইএমএফের একটি কার্যকর কর্মসূচি চালু থাকলে এর পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাংক এবং এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক-সহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার পথও সহজ হবে।


