ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই দীপেন দেওয়ানের বিদায়

ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই দীপেন দেওয়ানের বিদায়
দীপেন দেওয়ান। ছবি: বাসস
Advertisement
Advertisement

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনা এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনের ওপর প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের জের ধরেই পদত্যাগ করেছেন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।

তিনি জাতীয় সংসদের রাঙ্গামাটি আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতা।

সোমবার জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করলেও, ক্ষমতাসীন বিএনপির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, মন্ত্রী হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব হারানোর কারণেই মূলত তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

দীপেন দেওয়ানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার একজন সংসদ সদস্য টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, “তিনি (দীপেন দেওয়ান) কিছু শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন ঠিকই, তবে তা তার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কিংবা মন্ত্রী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি মন্ত্রিত্ব এবং দলীয় কর্মকাণ্ড দুটোই সমানতালে ও সুচারুভাবে চালিয়ে যাচ্ছিলেন।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাদের তথ্যমতে, প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই দীপেন দেওয়ান ও মীর হেলালের মধ্যে মতবিরোধের সূত্রপাত হয়। এই মতবিরোধ এক মাসের মধ্যে দ্বন্দ্বে রূপ নেয় এবং ধীরে ধীরে তা আরও তীব্র হতে থাকে।

এই দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস পর প্রতিমন্ত্রী হেলাল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সচিব মিজানুর রহমানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার (প্রতিমন্ত্রীর) অনুমোদন ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কোনো ফাইল যেন মন্ত্রীর কাছে পাঠানো না হয়।

সচিব অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন কোনো নির্দেশনা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে তিনি জানান, ফাইল প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমেই মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়, যা সাধারণ দাপ্তরিক নিয়ম।

সরকারের ‘রুলস অব বিজনেস’ বা কার্যবিধি অনুযায়ী, মন্ত্রী হলেন মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন নেই।

একজন সাবেক আইন সচিব টাইমস’কে বলেন, সাধারণত একটি মন্ত্রণালয়ের সচিব প্রথমে প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে ফাইল পাঠান। তবে মন্ত্রী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সাবেক সচিব বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে কিছু নির্দিষ্ট কাজ বণ্টন করে দেন।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক নিয়মটি চর্চা করা সম্ভব হয়নি। কারণ দীপেন  দেওয়ান নিজের মন্ত্রণালয় স্বাধীনভাবে চালাতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল তার প্রভাব খাটিয়ে সেখানে হস্তক্ষেপ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ দীপেন দেওয়ান বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন এবং জানান, প্রতিমন্ত্রীর সাথে কাজ করতে তার অস্বস্তি হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিমন্ত্রীকে আস্থায় নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের মতে, এই সিদ্ধান্তে দীপেন দেওয়ান বেশ হতাশ হন।

আরও পড়ুন

আরেকটি বড় কারণ ছিল তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন এবং প্রশাসক নিয়োগ। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিন পরই সরকার পার্বত্য জেলাগুলো বাদে দেশের বাকি সব জেলায় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করে।

গত ১৬ মে রাঙ্গামাটির মোনঘর অস্থায়ী হলে একটি জাপানি ভাষা শিক্ষার কোর্স উদ্বোধন করেন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, যেখানে তিন পার্বত্য জেলার বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে দীপেন দেওয়ান ঘোষণা করেন, ঈদুল আজহার আগেই পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠন করা হবে।

সেই অনুযায়ী, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দুইজনকে নিয়োগের ব্যাপারে মন্ত্রী এবং পার্বত্য অঞ্চলের অন্য সংসদ সদস্যরা একমত হন। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কে হবেন তা নিয়ে আলোচনায় তারা কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।

 এই পদক্ষেপে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলালের কোনো আপত্তি ছিল না বলেই জানা যায়। প্রসঙ্গত, মীর হেলাল চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপি নেতা মীর নাসির উদ্দিনের ছেলে।

তবে স্থানীয় বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা জানান, দীপেন দেওয়ান নিজের ভগ্নিপতি মানস মুকুরকে  রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করতে চেয়েছিলেন। এর তীব্র বিরোধিতা করেন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল। এই ঘটনা তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।

স্বাধীনভাবে মন্ত্রণালয় চালাতে না পারা এবং ঈদের আগে তিনটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠনে ব্যর্থ হওয়ায় দীপেন দেওয়ান ভীষণভাবে হতাশ হয়ে পড়েন। একজন সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত দীপেন দেওয়ান এতে অপমানিত বোধ করেন এবং নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে মন্ত্রিত্বের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রের খবর, দীপেন দেওয়ান সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান এবং তারা উভয়েই এতে একমত হন।

তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো দীপেন দেওয়ান নিজের পদত্যাগপত্র নিজে জমা দেননি। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমানের তথ্যমতে, তিনি তার একজনসহকারীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাস জমি বরাদ্দ এবং অন্যান্য সম্পদ বণ্টন নিয়েও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে এক ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছিল। প্রতিমন্ত্রীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছিল বলে অভিযোগ ওঠে। দীপেন দেওয়ান এই হস্তক্ষেপের বিষয়টি দলের হাইকমান্ডকে জানালেও কোনো সাড়া পাননি।

অন্যদিকে, দীপেন দেওয়ানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল যে, তিনি প্রতিমন্ত্রীকে এড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। মীর  হেলালের একজন সহকারীর দাবি, প্রতিমন্ত্রী গত মাসে এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করেছিলেন।

পদত্যাগের বিষয়ে দীপেন দেওয়ান কোনো মন্তব্য করতে চাননি। অন্যদিকে দীপেন দেওয়ানের সাথে কোনো দ্বন্দ্বের কথা অস্বীকার করেন মীর হেলাল। তিনি দাবি করেন, মন্ত্রী সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণেই পদত্যাগ করেছেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায় মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের এই আকস্মিক পদত্যাগ রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। দেশজুড়ে রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম দিয়েছে ব্যাপক আলোচনা।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছর পর, ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী, এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে অবশ্যই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান রয়েছে।

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর, শান্তি চুক্তি অনুযায়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে নতুন কোনো মন্ত্রী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই থাকবে।

বিচারক থেকে রাজনীতিবিদ

তেষট্টি বছর বয়সী দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচিত সব সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। দীপেন দেওয়ান প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান, আর মীর হেলাল হন প্রতিমন্ত্রী।

২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন দীপেন দেওয়ান। ২০১০ সালে তিনি রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

দীপেন দেওয়ানের বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতি বিষয়ক উপদেষ্টা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad