ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ঘটনার মাত্র ১৩ দিন পর। ব্যাপক জনরোষের মুখে এই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, একই ধরনের অনেক মামলা মাসের পর মাস তদন্তের স্তরেই আটকে আছে। অপরাধ বিচার ব্যবস্থার মধ্যে এমন অসম আচরণ ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অসংগতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা উদ্বেগ।
পল্লবীর ঘটনার পাঁচ দিন আগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে আরেকটি যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তবে সেই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন কবে জমা দেওয়া হবে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না পুলিশ।
পল্লবীর ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক নিন্দার ঝড় তোলে, সংবাদমাধ্যমেও এর ব্যাপক প্রচার হয়। এর বিপরীতে সাতকানিয়ার ঘটনাটি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে খুবই কম। এই বৈপরীত্য দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার ব্যবস্থার কাছ থেকে ভিন্ন মাত্রার মনোযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সরকারি পদক্ষেপের গতি সম্ভবত এই বৈষম্যকেই প্রতিফলিত করে।
এই দুই মামলার বাইরেও বৈষম্যের এমন চিত্র আরও দেখা যায়। পল্লবীর ঘটনার একদিন পর ২০ মে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে এক কিশোর শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানায়নি যে তদন্ত প্রতিবেদন কবে জমা দেওয়া হবে।
মানবাধিকার কর্মী এবং আইন বিশ্লেষকরা বলেন, একই ধরনের ফৌজদারি মামলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার এই ভিন্ন দৃশ্য বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার ব্যবস্থার ভেতরের বৈষম্যকেই প্রকাশ করে। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেন, কোনো মামলা যখন রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তখন সেটি প্রায়শই দ্রুত গতিতে এগোয়। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, এটি বিচার ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।
পল্লবীর হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই দ্রুত এবং দৃশ্যমান। শিশুটির মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। পাঁচ দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। আইনমন্ত্রী জনসমক্ষে আগেই ঘোষণা করেছিলেন কখন মামলার বিচার কাজ শুরু হবে।
বিপরীতে পুলিশ জানিয়েছে, সাতকানিয়ায় দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, সাত আসামির মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি দুই সন্দেহভাজনকে ধরার চেষ্টা চলছে।
তদন্ত প্রতিবেদন কেন এখনো জমা দেওয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশ চিকিৎসা পরীক্ষার প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই প্রতিবেদনটি কবে আসতে পারে জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, এতে দুই মাস, চার মাস বা কখনো কখনো ছয় মাসও লেগে যেতে পারে। এর অর্থ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতেও ছয় মাস পর্যন্ত দেরি হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তা সম্ভব।
বনশ্রীতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, তারা যৌন নির্যাতনের আলামত পেয়েছে। মামলার অগ্রগতি জানতে চাইলে রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. বাহার মিয়া টাইমস’কে বলেন, তদন্তকারীরা ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীর ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পেয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন একজন সন্দেহভাজন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য এখনও সময় আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই মামলাটি কেন পল্লবীর মামলার মতো দ্রুত এগোলো না, যেখানে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে বিচার শুরু হয়েছিল–এমন প্রশ্নে এই পুলিশ কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের বোরহান উদ্দিন খান বলেন, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান হলেও বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলো প্রায়শই বিচারের গতিকে প্রভাবিত করে। বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং মামলার বিপুল চাপ দ্রুত বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। আদালতগুলো দীর্ঘ দিন ধরে মামলার জট নিয়ে জর্জরিত, যার ফলে সব তদন্ত ও বিচার একই গতিতে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যদিও প্রতিটি মামলাই ভুক্তভোগীদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক অন্যান্য মামলাতেও একই ধরনের বিলম্ব লক্ষ্য করা গেছে। ২০ মে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় ৭১ বছর বয়সী এক বিধবাকে ধর্ষণ এবং তার পরের দিন চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগের তদন্ত পুলিশ এখনো শেষ করতে পারেনি।
বাকলিয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার পরপরই এক সন্দেহভাজনকে ঘেরাও করে, যা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের রূপ নেয়। জনগণের এমন প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও তদন্তের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান বলেন, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং জনমতের কাছ থেকে যে মামলাগুলো ব্যতিক্রমী মনোযোগ পায়, সেগুলো বিচার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং জনগণের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হওয়ার প্রবণতা দেখায়।
বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বলেন, আলোচিত এবং কম পরিচিত উভয় ধরনের মামলাই সমাজে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তবে অনেক ঘটনাই পর্যাপ্ত জনদৃষ্টি বা প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগগুলো প্রায়শই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত না হওয়ার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পল্লবী ধর্ষণ তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন
পল্লবী ধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্ত খুব দ্রুত শেষ হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ গঠনের শুনানির সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতকে জানায়, সে শিশুটিকে খুন করেনি, তবে হত্যার পর মরদেহটি খণ্ডিত করেছিল।
সে আদালতে বলে, ‘আমি ধর্ষণ করিনি, শুধু লাশ কেটেছি। ডলার নামের একজন ধর্ষণ করেছে। আমি পাপ করেছি এবং সেই পাপের শাস্তি আমার পাওয়া উচিত।’
আদালতের নথিপত্রে ‘ডলার’ নামে অভিহিত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তারা এই দাবিটি যাচাই করতে পারেননি। সোহেল রানা আদালতে আরও অভিযোগ করে, ডলার তাকে মেয়েটিকে এনে দিতে পারলে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে বাধা দেয়।
সে আরও অভিযোগ করে, পুলিশ তার ডিএনএ পরীক্ষাও করেনি। সোহেল রানা এই মামলার দ্বিতীয় আসামি তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও নির্দোষ বলে দাবি করে।
আদালতে উল্লেখ করা ব্যক্তিকে সনাক্ত বা খুঁজে বের করতে তদন্তকারীরা কেন ব্যর্থ হলেন জানতে চাইলে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান টাইমস’কে বলেন, সোহেল রানা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এই নামটি উল্লেখ করেছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি ডলার আসলে কে ছিল বা পুলিশ তাকে সনাক্ত করার কোনো চেষ্টা করেছিল কি না। তদন্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার তদন্তে কোনো ত্রুটি নেই। এটি বাংলাদেশের সেরা তদন্ত।’
তবে তদন্তের গতি ও মান নিয়ে এই মামলায় জড়িত আইনজীবীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামির আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ আদালতের সামনে যুক্তি দেখান, এই তদন্তে দুর্বলতা রয়েছে। এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তিনি বলেন, তদন্তটি তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে। পুলিশ কোনো প্রত্যক্ষদর্শী হাজির করতেও ব্যর্থ হয়েছে।
মানবাধিকার আইনজীবী মনজিল মোরসেদও অস্বাভাবিক দ্রুততায় তদন্ত শেষ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, চার দিনের মধ্যে একটি তদন্ত শেষ হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। যেহেতু সোহেল রানা ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছে, তাই এই পর্যায়ে শত্রুতার বশে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনার কারণ খুব কমই থাকে।
মনজিল মোরসেদ একটি আইনি নীতিও উল্লেখ করেন যা প্রায়শই ‘বিচার তাড়াহুড়ো করলে, বিচার সমাহিত হয়’ বাক্যাংশ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো কখনো কখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার ন্যায্যতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।


